ঢাকা, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ২ আশ্বিন ১৪২৬


যতবার বেঁচে গেছেন শেখ হাসিনা

২০১৯ আগস্ট ২১ ১০:২৯:১৪

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : ১৯৮১ সালের ১৭ মে দেশে ফেরার পর থেকে স্বাধীনতাবিরোধী, জঙ্গি ও সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা চালিয়েছে বারবার।

২০১৫ সাল পর্যন্ত শেখ হাসিনাকে ১৯ বার হত্যার চেষ্টা করা হয় বলে আওয়ামী লীগের মুখপত্র ‘উত্তরণ’ এ প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়। এরপর তাকে বহনকারী বিমানে দু’বার নাশকতার চেষ্টা হিসেবে ধরলে তাকে হত্যার চেষ্টা করা হয় মোট ২১ বার।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় অবিশ্বাস্যভাবে অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে তার ভাষণ শেষ হওয়ার পরপরই গ্রেনেড হামলা করা হয়।

শেখ হাসিনার ওপর প্রথম আক্রমণ আসে ১৯৮৮ সালের ২৪ জানুয়ারি। ওইদিন চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের খুব কাছে আটদলীয় জোটের মিছিলে শেখ হাসিনাকে হত্যা করতে পুলিশ ও বিডিআর গুলি ছোড়ে।

এতে ৭ জন নিহত ও ৩০০ জন আহত হয়। তিনি পতেঙ্গা বিমানবন্দরে নেমে একটি সন্ত্রাবিরোধী সমাবেশে যোগ দেওয়ার জন্য লালদীঘিতে যাচ্ছিলেন।

১৯৮৯ সালের ১১ আগস্ট রাত ১২টার দিকে ফ্রিডম পার্টির একদল সশস্ত্র সন্ত্রাসী বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবনে হামলা চালায়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা, আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা তখন বাসভবনে ছিলেন।

হামলাকারীরা প্রায় ১০ মিনিট ধরে বঙ্গবন্ধু ভবন লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং একটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। গ্রেনেডটি বিস্ফোরিত না হওয়ায় বেঁচে যান শেখ হাসিনা।

১৯৯১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ধানমন্ডি স্কুলে উপ-নির্বাচনের ভোট দিয়ে গ্রিন রোডে পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র দেখতে যান শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি গাড়ি থেকে নামার সঙ্গে সঙ্গে তার ওপর গুলি ও বোমা বিস্ফোরণ করা হয়।

১৯৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে দেশের পশ্চিমাঞ্চলে সফরে যান তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা। যশোর, দর্শনা, কুষ্টিয়া, ঈশ্বরদী, নাটোর ও সান্তাহারে জনসভা করেন তিনি।

এরপর ২৩ সেপ্টেম্বর ঈশ্বরদী স্টেশনে প্রবেশের মুখে তার দিকে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। পরে নাটোর রেলস্টেশনে তার ট্রেনকে লক্ষ্য করে গুলি, বোমা এবং সমাবেশস্থলেও গুলি-বোমা ছোড়া হয়।

১৯৯৫ সালের ৭ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় রাসেল স্কয়ারে (ধানমন্ডি ৩২ এর পাশে) সমাবেশে ভাষণ দেওয়ার সময় আওয়ামী লীগ সভাপতিকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়।

১৯৯৬ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে শেখ হাসিনার বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই একটি মাইক্রোবাস থেকে সভামঞ্চে গুলি ও বোমা নিক্ষেপ করা হয়। এতে ২০ জন আহত হয়।

হরকাতুল জিহাদের বড় আক্রমণটি ছিল শেখ হাসিনার নিজের নির্বাচনি এলাকা গোপালগঞ্জের কোটালিপাড়ায়। ২০০০ সালের ২০ জুলাই গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় জনসভাস্থল ও হেলিপ্যাডের কাছে ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রেখেছিল হুজি।

স্থানীয় এক চায়ের দোকানি একটি তার পুঁতে রাখা দেখে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জানালে মাটি খুঁড়ে ৭৬ কেজি ওজনের সেই বোমা উদ্ধার করা হয়। ২২ জুলাই স্থানীয় শেখ লুৎফুর রহমান ডিগ্রি কলেজ মাঠের এক সভায় প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল।

২০০১ সালের ২৯ মে খুলনার রূপসা সেতুর নির্মাণকাজ উদ্বোধন করতে যাওয়ার কথা ছিল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। জঙ্গি সংগঠন হুজি শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে সেখানে বোমা পুঁতে রাখে যা গোয়েন্দা পুলিশ উদ্ধার করে।

২০০১ সালে নির্বাচনি প্রচারে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট গিয়েছিলেন। সেদিন রাত ৮টার দিকে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা ময়দানের জনসভাস্থল থেকে ৫০০ গজ দূরে একটি বাড়িতে বোমা বিস্ফোরিত হলে ঘটনাস্থলেই দু’জনের মৃত্যু হয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার ছেলে-মেয়েসহ ৩১ জনকে হত্যার একটি ই-মেইল ফাঁস হয় ১২ জুলাই ১৯৯৯ সালে একটি সংবাদপত্রে। ই-মেইলটির প্রেরক ইন্টার এশিয়া টিভির মালিক শোয়েব চৌধুরী।

শেখ হাসিনাকে হত্যা, গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত এবং বিদ্বেষ সৃষ্টির লক্ষ্যে ই-মেইল পাঠানোর অভিযোগে শোয়েব চৌধুরীর বিরুদ্ধে ঢাকার সিএমএম আদালতে মামলা দায়ের হয়।

২০০২ সালের ৪ মার্চ যুবদল ক্যাডার খালিদ বিন হেদায়েত নওগাঁয় বিএমসি সরকারি মহিলা কলেজের সামনে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা চালায়।

২০০২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরার কলারোয়ার চন্দনপুর ইউনিয়নের হিজলি গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার ধর্ষিতা স্ত্রীকে দেখতে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে গিয়েছিলেন শেখ হাসিনা।

সেখান থেকে যশোর ফেরার পথে কলারোয়া উপজেলা বিএনপি অফিসের সামনে তৎকালীন এমপির নির্দেশে দলটির নেতাকর্মীরা দলীয় অফিসের সামনে একটি যাত্রীবাহী বাস রেখে সড়কে ব্যারিকেড দিয়ে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে হামলা চালায়।

ওই হামলায় জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান, সাংবাদিকসহ কমপক্ষে ১২ জন দলীয় নেতাকর্মী আহত হন।

২০০৪ সালের ২ এপ্রিল বরিশালের গৌরনদীতে শেখ হাসিনার গাড়িবহরে গুলিবর্ষণ করে জামায়াত-বিএনপির ঘাতক চক্র।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শান্তি সমাবেশস্থলে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়।
এতে শেখ হাসিনা এবং আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় কয়েকজন নেতা অল্পের জন্য বেঁচে গেলেও হামলায় আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমান এবং আরও ২৩ জন নেতাকর্মী নিহত এবং ৪০০ জন আহত হন।

এক-এগারোর সরকার শেখ হাসিনাকে ২০০৭ সালের ১৬ জুলাই গ্রেফতার করে। তাকে রাখা হয় জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় স্থাপিত বিশেষ সাব-জেলে।

সেখানে শেখ হাসিনার খাবারে ক্রমাগত পয়জন দিয়ে তাকে মেরে ফেলার চেষ্টা করা হয়। স্লো পয়জনিংয়ের কারণে সেখানে আটক থাকাকালে শেখ হাসিনা অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন।

২০১১ সালের ডিসেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত ও হত্যা করার লক্ষ্যে একটি সামরিক অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনা করা হয়েছিল যা পরে ব্যর্থ হয়ে যায়।

বিশ্বজুড়ে তথ্য ফাঁসে আলোচিত প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস প্রকাশিত সৌদি আরবের এক গোপন বার্তায় দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হত্যাকাণ্ডে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি শরিফুল হক ডালিম এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত ছিলেন।

তিন দেশে বসে এ অভ্যুত্থান চেষ্টার পরিকল্পনা চলছিল, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৬ জন অবসরপ্রাপ্ত ও কর্মরত সদস্য এতে জড়িত ছিলেন।

প্রকাশিত নথি অনুসারে, বাংলাদেশে অবস্থিত সৌদি রাষ্ট্রদূতের পক্ষ থেকে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দেশটির পররাষ্ট্র দফতরে আরবি ভাষায় পাঠানো ‘অত্যন্ত গোপনীয়’ ওই নথিতে বলা হয়েছে, ২০১১ সালে ব্যর্থ করে দেওয়া এক সামরিক অভ্যুত্থানের পরিকল্পনা হয়েছিল হংকং, থাইল্যান্ড এবং মালয়েশিয়ায় বসে।

এ পরিকল্পনায় খালেদা জিয়া, তারেক জিয়া ও জামায়াতের সংশ্লিষ্টতা ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। এ অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যুক্ত একজন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী ইশরাক আহমেদ অর্থায়ন করেন বলে উল্লেখ করা হয়।

২০১২ সালের ১৯ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আনুষ্ঠানিকভাবে ২০১১ সালের ডিসেম্বরে ব্যর্থ করে দেওয়া ওই অভ্যুত্থান চেষ্টার কথা প্রকাশ করে।

২০১১ সালে শ্রীলঙ্কার একটি সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের সঙ্গে একটি আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র সুইসাইড স্কোয়াড গঠন করে শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য চুক্তি করে। সেজন্য আগাম টাকাও দেওয়া হয় শ্রীলঙ্কার সেই সন্ত্রাসবাদী গ্রুপের আততায়ীদের।

সে সময় সেই আততায়ীদের টিম গাড়িতে করে কলকাতা বিমানবন্দরে যাওয়ার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হলে ভেস্তে যায় শেখ হাসিনাকে হত্যার সেই পরিকল্পনা।

পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান বিস্ফোরণের ঘটনায় গ্রেফতার জঙ্গি শাহানুর আলম ওরফে ডাক্তার জানান, ২০০৪ সালে প্রশিক্ষিত নারী জঙ্গি দিয়ে মানববোমায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার পরিকল্পনা হয়েছিল।

টাইমস অব ইন্ডিয়া, জি-নিউজসহ বেশ কিছু ভারতীয় গণমাধ্যমে এ তথ্য প্রকাশিত হয়। শাহানুরের স্ত্রী সুজেনা জানান, রাজীব গান্ধী হত্যাকাণ্ডের মতো নারী ‘মানববোমা’ ব্যবহার করে শেখ হাসিনাকে হত্যা করার পরিকল্পনা ছিল তাদের।

২০১৫ সালের ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে যাওয়ার পথে কাওরান বাজারে তার গাড়িবহরে বোমা হামলা চালানোর চেষ্টা চালায় জেএমবি এর জঙ্গিগোষ্ঠী। কাওরান বাজার এলাকায় তার গাড়ি লক্ষ্য করে পরপর কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণ হয়।

২০১৬ সালের ২৭ নভেম্বর হাঙ্গেরি যাওয়ার পথে জ্বালানি তেল ফুরিয়ে যাওয়ায় তুর্কেমেনিস্তানের রাজধানী আশখাবাদে জরুরি অবতরণ করতে বাধ্য হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমান। পরে তদন্ত কমিটি রিপোর্ট দেয় এটি মনুষ্য সৃষ্ট ত্রুটি।

তখন বিভিন্ন মহল থেকে বলা হয়েছিল, জ্বালানি ট্যাঙ্কির নাট এমনভাবে ঢিল করে দেওয়া হয়েছিল যে, বিমানটি যখন কৃষ্ণ সাগরের ওপর দিয়ে উড়ে যাবে তখন জ্বালানি ফুরিয়ে যাবে।

জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ার পর ৪০ মিনিট পর্যন্ত বিমান উড়তে পারে, কিন্তু এ সাগরের চার ঘণ্টার দূরত্বের কমে কোথাও বিমানবন্দর না থাকায় বিমানটিতে আগুন ধরে যেতো। বিমান বিধ্বস্ত হয়ে মারা যেতে পারতেন বিমানে থাকা সব যাত্রী।

কিন্তু কৃষ্ণ সাগরে যাওয়ার আগেই জ্বালানি ফুরিয়ে যাওয়ায় এর কাছাকাছি বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করেন পাইলট যা আধাঘণ্টা দূরত্বে ছিল।

এই বিমানেই আরও একটি নাশকতার খবর সংবাদপত্রে ছাপা হয়েছিল। ঘটনাটি ২০১৬ সালের জুন মাসের। প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী একটি বিমান ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে নামতে গিয়ে আবার ওপরে উঠে যায়।

প্রায় ৩৫ মিনিট ঢাকার আকাশে চক্কর দিয়ে পরে রানওয়েতে নামে বিমানটি। রানওয়েতে ধাতব পদার্থের উপস্থিতি থাকায় বিমানটি নামেনি। পরে রানওয়ে পরিষ্কার করা হলে বিমানটি অবতরণ করে।

বিজনেস আওয়ার/২১ আগস্ট, ২০১৯/এ

উপরে