ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬


সম্রাটের সাম্রাজ্য বিস্তার হয়েছে যেভাবে

২০১৯ অক্টোবর ০৭ ০৮:৩৯:৫৩


বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ, বাড়ি ও জমিদখল সবই নিয়ন্ত্রণ করেছেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সদ্য বহিষ্কৃত সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট। রাজধানীর ক্লাবপাড়ায় রমরমা জুয়ার আসর পরিচালনা করে ব্যাপক আলোচিত হন।

ক্লাবগুলোতে জুয়ার আধুনিক সংস্করণ 'ক্যাসিনো' ব্যবসাও যুক্ত করেন সম্রাট। এ কারণে জুয়াড়িদের কাছে তিনি 'ক্যাসিনো সম্রাট' নামেও পরিচিত। জুয়া ছাড়াও ঢাকা দক্ষিণের গোটা অঞ্চলেই ছিল তার দাপট।

ফেনীর পরশুরাম উপজেলার অধিবাসী সম্রাটের বাবা রাজউকের ছোটো পদে চাকরি করতেন। বাড়ি পরশুরামে হলেও সেখানে তাদের পরিবারের কেউ থাকেন না।

বাবার চাকরির সুবাদে ঢাকায় বড়ো হন সম্রাট। পরিবারের সঙ্গে প্রথমে বসবাস করতেন কাকরাইলে সার্কিট হাউস সড়কের সরকারি কোয়ার্টারে। তিন ভাইয়ের মধ্যে সম্রাট দ্বিতীয়।

জানা গেছে, গত দুই সপ্তাহ ধরে গোয়েন্দা নজরদারির মধ্যে ছিলেন ইসমাইল হোসেন সম্রাট। এর মধ্যে থেকেও তিনি দেশ ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তবে তার সেই চেষ্টা সফল হননি।

একপর্যায়ে গতকাল রবিবার রাতে সম্রাটকে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে আত্মীয় মনিরুল ইসলামের বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে র‍্যাপিড একশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব)।

রাজনীতিতে আগমন:

সম্রাটের রাজনীতিতে আগমন ঘটে ১৯৯০ দশকের শুরুর দিকে। এ সময় কিছুদিন ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অবশ্য তার আগে এরশাদের জাতীয় পার্টির ছাত্র সংগঠন ছাত্রসমাজের সঙ্গেও তার সম্পৃক্ততা ছিল বলে পরিচিতজনরা জানিয়েছেন।

বিএনপির ১৯৯১-৯৬ আমলে ছাত্রলীগ ছেড়ে দিয়ে যুবলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন। ১৯৯৩ সালে ৫৩ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্মসম্পাদকের দায়িত্ব পান সম্রাট।

সে সময় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম যুবলীগের চেয়ারম্যান ছিলেন। ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েই বেপরোয়া হয়ে উঠতে থাকেন সম্রাট।

নিজের ওয়ার্ড সভাপতি লুত্ফুর রহমানকে মারপিটের অভিযোগও উঠেছিল তার বিরুদ্ধে। কিন্তু ওই ঘটনায় সম্রাটসহ তিন জনকে সংগঠন থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হলেও পরে তা আর বাস্তবায়ন হয়নি। এরপর থেকে মতিঝিলের ক্লাব পাড়ায় সম্রাটের আনাগোনা বেড়ে যায়।

২০০৩ সালে যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন সম্রাট। সে সময় দক্ষিণের সভাপতি ছিলেন মহিউদ্দিন আহমেদ মহি, আর সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বর্তমান এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন।

মূলত শাওনই সম্রাটকে পৃষ্ঠপোষকতা দিতেন। শাওনের বিশ্বস্ত হিসেবেই সম্রাট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সাল থেকে ঢাকা সিটি করপোরশনের দরপত্র নিয়ন্ত্রণ করতেন।

পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে সম্রাট ঢাকা মহানগর যুবলীগ দক্ষিণের সভাপতি হন। এরপর আর তার পেছনে তাকাতে হয়নি। সভাপতির দায়িত্ব নেওয়ার পর আরমানকে সহসভাপতি করে নেন তিনি।

বিশাল অফিস:

যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণের নিজস্ব কোনো কার্যালয় না থাকলেও সম্রাট দায়িত্ব নেওয়ার পর কাকরাইলে রাজমণি সিনেমা হলের উল্টো দিকে বিশাল এক ভবনের পুরোটাজুড়ে অফিস শুরু করেন।

সাংগঠনিক কাজের কথা বলা হলেও এখানে বসেই সম্রাট ক্যাসিনো ব্যবসা থেকে শুরু করে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এখানে থাকত তার কর্মী বাহিনী ও অপকর্মের সঙ্গীদের আনাগোনা।

যে রাতে খালেদ মাহমুদ গ্রেফতার হন, ওই রাতে সম্রাট তার অফিসেই ছিলেন বলে জানা যায়। অবশ্য পরিবার নিয়ে তার বসবাস মহাখালী ডিওএইচএসের একটি বাড়িতে।

সম্রাটের যত অপকর্ম:

নানা অপকর্মের পাশাপাশি ইসমাইল হোসেন সম্রাট যুবলীগ ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের দৃষ্টি কাড়েন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে লোকবল সাপ্লাই আর অর্থ দিয়ে। তার রয়েছে বিশাল কর্মী বাহিনী।

আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বড়ো ধরনের শোডাউন দেখাতেন তিনি। কর্মী বাহিনীকে একেক কর্মসূচিতে একেক ধরনের পোশাক পরিয়ে দৃষ্টি কাড়তেন সবার। এজন্য যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী সম্রাটকে 'শ্রেষ্ঠ সংগঠক' বলে আখ্যায়িত করেন।

এমনকি ক্যাসিনো ব্যবসার খবর প্রকাশের পরও তার পক্ষে অবস্থান নেন যুবলীগ চেয়ারম্যান। গণমাধ্যমকর্মীদের একটি অংশের সঙ্গেও রয়েছে তার সখ্য। যে কারণে সম্রাটের যে কোনো কর্মসূচির মিডিয়া কাভারেজও ছিল চোখে পড়ার মতো।

গত বছর সম্রাটের বিরুদ্ধে আঞ্জুমান মফিদুল ইসলামের কাছে কোটি টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ ওঠে। এটা জানতে পেরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার ওপর চরম ক্ষুব্ধ হন।

গত বছরের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সম্মেলনে যাওয়ার আগে তিনি যুবলীগ দক্ষিণের কমিটি ভেঙে দেওয়ার নির্দেশনা দিয়ে যান। তবে সেই নির্দেশনা বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে সম্রাটের জুয়া ও ক্যাসিনো ব্যবসার রিপোর্ট পান প্রধানমন্ত্রী।

এছাড়া প্রধানমন্ত্রী কিছুদিন আগে কানাডা সফরে গেলে মতিঝিল এলাকার সাবেক একজন ছাত্রনেতা সম্রাটের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ তোলেন। সম্রাটের কারণেই তিনি রাজনীতি ছেড়ে কানাডা চলে গেছেন বলে জানান।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সর্বশেষ বৈঠকে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলতে গিয়ে আবারও সম্রাটের নাম আসে।

তখন প্রধানমন্ত্রী সম্রাটের জুয়া ক্যাসিনো ব্যবসার উল্লেখ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেন। এরপরই গ্রেফতার হন যুবলীগ ঢাকা মহানগর দক্ষিণে সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। আলোচনায় আসে সম্রাটের নামও।

ক্যাসিনো সম্রাট:

সম্রাটের নেশা ও পেশা জুয়া খেলা। তিনি একজন পেশাদার জুয়াড়ি। প্রতি মাসে অন্তত ১০/১২ দিন সিঙ্গাপুরে যান জুয়া খেলতে। সেখানে টাকার বস্তা নিয়ে যান তিনি।

সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে বড়ো জুয়ার আস্তানা মেরিনা বে স্যান্ডস ক্যাসিনোতে তিনি ভিআইপি জুয়াড়ি হিসেবে পরিচিত। প্রথম সারির জুয়াড়ি হওয়ায় সিঙ্গাপুরের চেঙ্গি এয়ারপোর্টে তাকে রিসিভ করার জন্য বিশেষ ব্যবস্থাও রয়েছে।

এয়ারপোর্ট থেকে ক্যাসিনো পর্যন্ত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় বিলাসবহুল 'লিমুজিন' গাড়িতে। সিঙ্গাপুরে জুয়া খেলতে গেলে সম্রাটের সঙ্গী হন যুবলীগ দক্ষিণের নেতা আরমান, মোমিনুল হক সাঈদ ওরফে সাঈদ কমিশনার, সম্রাটের ভাই বাদল ও জুয়াড়ি খোরশেদ আলম।

সম্রাটের বড়ো ভাই বাদল চৌধুরী ঢাকায় তার ক্যাসিনো ব্যবসা দেখাশোনা করতেন। ছোটো ভাই রাশেদ ছাত্রলীগের রাজনীতি করেন। তার বাবা অনেক আগেই মারা গেছেন। মা বড়ো ভাইয়ের সঙ্গে থাকেন। ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর পরিবারের সবাই গা ঢাকা দেন।

জানা গেছে, সম্রাটের ঘনিষ্ঠ দুই সহচর হলেন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। যুবলীগের আরেক প্রভাবশালী নেতা জি কে শামীমও সম্রাটকে অবৈধ আয়ের ভাগ দিতেন।

বিজনেস আওয়ার/০৭ অক্টোবর, ২০১৯/এ

উপরে