ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ অক্টোবর ২০১৯, ৩ কার্তিক ১৪২৬


আবরারকে পেটায় ২২ জন

২০১৯ অক্টোবর ০৯ ০৮:৫৫:৩৭

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : পড়ালেখার চাপ থাকায় ছুটি কাটিয়ে গত রবিবার হলে ফেরেন আবরার। সন্ধ্যায় বুয়েট শেরেবাংলা হলের ১০১১ নম্বর কক্ষে ব্যস্ত ছিলেন পড়ালেখায়।

সুত্রে জানা গেছে, রাত ৮টার দিকে আবরারকে ওই হলের দোতলার ২০১১ নম্বর টর্চার সেলে ডেকে নিয়ে হুমকি দিতে শুরু করেন বুয়েট ছাত্রলীগের নেতারা।

এ পর্যায়ে ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক অনিক সরকার আবরারের মোবাইল ফোন কেড়ে নিয়ে ফেসবুক ঘেঁটে বাছ-বিচার না করেই হকি স্টিক দিয়ে পেটাতে শুরু করেন।

সেখানে অবস্থান করা সাংগঠনিক সম্পাদক মেহেদী হাসান রবিনও আবরারকে পেটানোতে অংশ নেন। ওই সময় ক্রীড়া সম্পাদক মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন আবরারের হাত ধরে রাখেন। আর আবরারের পায়ে পেটান উপসমাজসেবা সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল।

সদস্য মুনতাসির আল জেমি, মো. মুজাহিদুর রহমান মুজাহিদ, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র খন্দকার তাবাখখারুল ইসলাম তানভীর, একই বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ইশতিয়াক মুন্নাও নির্দয়ভাবে পেটাতে শুরু করেন আবরারকে।

কেউ হকি স্টিক দিয়ে, কেউ লাঠি দিয়ে, কেউ বা কিল-ঘুষি দিয়ে ইচ্ছামতো আবরারকে পেটানোতে অংশ নেন। এভাবে ২২ জন অংশ নেন এই ভয়ংকর নির্যাতনে। আবরার একটু কাঁদতেও পারেননি। কারণ তখন তাঁর মুখ চেপে ধরা হয়েছিল।

চরম এই নির্যাতনের মধ্যেও আবরার বলেছিলেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি, আমাকে মেরো না। আরো কিছু বলার চেষ্টা করলেও নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় তা আর বলতে পারেননি।

ওই অবস্থার মধ্যেই টর্চার সেলে প্রবেশ করেন বুয়েট ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান রাসেল ও সহসভাপতি মুহতাসিম ফুয়াদ। তাঁরাও অপেক্ষা না করে নিস্তেজ প্রায় আবরারকে পেটাতে শুরু করেন।

এভাবেই একপর্যায়ে মেধাবী ছাত্র আবরার মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাঁদের গ্রেপ্তার করে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এমন ভয়ংকর তথ্য পেয়েছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

এ ব্যাপারে ডিবির যুগ্ম কমিশনার মাহবুব আলম বলেন, প্রাথমিক তদন্ত ও ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা ভিডিও ফুটেজে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আবরার হত্যাকাণ্ডে জড়িত ১৯ জনের তথ্য পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে ১৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

ঘটনার সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগের আইনবিষয়ক উপসম্পাদক ও পুরকৌশল বিভাগের ছাত্র অমিত সাহা। কিন্তু তাঁকে মামলার আসামি করা হয়নি। এজাহারের বাইরেও এ হত্যার ঘটনায় আরো তিনজনের জড়িত থাকার তথ্য পেয়েছে গোয়েন্দারা।

ডিবি সূত্র জানায়, আবরারকে পেটানোর ঘটনায় সরাসরি অংশ নেওয়া ১০ জনকে গত সোমবার রাতে বুয়েট ক্যাম্পাস থেকেই গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া এ হত্যার ঘটনায় শামসুল আরেফিন রাফাত (২১), মনিরুজ্জামান মনির এবং আকাশ হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এর মধ্যে রাফাত মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র। মনির ওয়াটার রিসোর্সেস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ এবং আকাশ সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তাঁদেরও রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

এ ব্যাপারে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা বলেন, এভাবে কোনো ছাত্রকে, একজন মানুষকে কেউ কি পেটায়। একটা বাচ্চা ছেলেকে ওরা পেটাতে পেটাতে মেরেই ফেলল! আমি বিস্মিত হয়েছি।

গ্রেপ্তার মেহেদী হাসান রাসেল ও মুহতাসিম ফুয়াদকে জিজ্ঞাসাবাদকারী এক কর্মকর্তা বলেন, গত সোমবার গভীর রাতে এ দুজন জিজ্ঞাসাবাদে আবরারকে ভয়াবহ নির্যাতনের কথা স্বীকার করে। তারা এখন বলছে, আবরারকে মেরে নিজেদের জীবনও শেষ।

ডিবির অন্য একটি সূত্র জানিয়েছে, এই মামলায় জড়িত সব আসামিকেই পর্যায়ক্রমে গ্রেপ্তার করা হবে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় পুলিশ সদর দপ্তর থেকে ঘটনায় জড়িত বিষয়ে তদারকি করা হচ্ছে। এদিকে ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করে তার নিবিড় তদন্ত চলছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আবরারকে পেটানোর একপর্যায়ে নিস্তেজ হয়ে যান। তার পরও নির্যাতন থামেনি। আবরার নড়াচড়া বন্ধ করে দিলে ছাত্রলীগের নেতারা হলের অন্য ছাত্রদের ডেকে আবরারের নিথর দেহটি দোতলা ও নিচতলার মাঝামাঝি সিঁড়িতে ফেলে রাখেন।

এরপর রাতে ছাত্রলীগ নেতারা যখন রাতের খাবার খেতে বাইরে যান তখন তাঁরা নিশ্চিত হন আবরার আর বেঁচে নেই। পরে আবরারের লাশ সিঁড়ি থেকে নিয়ে রাখা হয় হলের ক্যান্টিনে।

এরপর ভোরের দিকে নেওয়া হয় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে। তখন কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।

জানা গেছে, ঢাকা-দিল্লির মধ্যে সাম্প্রতিক কিছু চুক্তির সমালোচনা করে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন আবরার। অনেকের ধারণা, এতেই তাঁকে ভিন্নমতাদর্শী রাজনৈতিক দলের কর্মী ভেবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তবে এটিই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ কি না, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।

বিজনেস আওয়ার/০৯ অক্টোবর, ২০১৯/এ

উপরে