sristymultimedia.com

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯, ২৯ কার্তিক ১৪২৬

ক্যাসিনো ইস্যু

খাঁচায় বন্দি চার, রইল বাকি ১

০৩:৩৬পিএম, ১৪ অক্টোবর ২০১৯

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : রাজধানীতে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনায় খ্যাতি পেয়েছেন পাঁচজন (বহিষ্কৃত) যুবলীগ নেতা। ঢাকার নামীদামী ক্লাবগুলোতে রাতবিরাতে যাতায়াতকারীদের কাছে এই পাঁচজন 'ক্যাসিনো গুরু' হিসেবে পরিচিত।

এই পাঁচজন হলেন- ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট, খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া, এনামুল হক আরমান, জিকে শামীম এবং কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। এদের মধ্যে প্রথম চারজন এরই মধ্যে গ্রেফতার হয়েছেন।

ক্যাসিনো পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে শুধু একজন এখনও অধরা। তিনি হলেন- মমিনুল হক সাঈদ ওরফে ক্যাসিনো সাঈদ। তিনি এখন লাপাত্তা। বিদেশে নিরাপদে আছেন তিনি। ক্যাসিনো সম্রাটের এই ক্যাশিয়ারকে দেশে আনার বিষয়ে প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ নেই।

ক্যাসিনোকাণ্ডে ধরা পড়েছেন আরও কয়েকজন দুর্ধর্ষ জুয়াড়ি। তারা হলেন- দেশের অনলাইন ক্যাসিনোর মূলহোতা সেলিম প্রধান, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান ভূঁইয়া। ধরা না পড়লেও নাম এসেছে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান আহমেদের।

এদের সঙ্গেও ক্যাসিনো পঞ্চপাণ্ডবের কোনো না কোনো যোগসাজশ পাওয়া গেছে। যেমন লোকমান ভূঁইয়া গ্রেফতারের পর স্বীকারোক্তিতে বলেছেন, তার ক্যাসিনো আয়ের ভাগ পেতেন ক্যাসিনো সাঈদ। তাকে প্রতিমাসে মাসোয়ারা দিতে হতো তাকে।

আবার জিসান আহমেদের অবৈধ আয়ের জোগানদাতা ছিলেন সম্রাট, জিকে শামীম ও খালেদ। একপর্যায়ে প্রভাব বিস্তার ও অন্যান্য কারণে জিকে শামীম ও খালেদের সঙ্গে বিরোধ হয় জিসানের।

এই দুজনকে মারতে লোক ভাড়া করেন দুবাই অবস্থান করা জিসান। অনলাইন ক্যাসিনোর মূলহোতা সেলিম প্রধানের সঙ্গেও অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসায় যোগসাজশ ছিল ওই পঞ্চপাণ্ডবের।

ক্যাসিনো পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে আরও অনেক মিল রয়েছে। তাদের মধ্যে চারজন ক্যাসিনো সম্রাট, খালেদ, আরমান ও সাঈদ একই কমিটির নেতা। তারা প্রত্যেকেই যুবলীগের শীর্ষ নেতার আশীর্বাদপুষ্ট। তারা মিলেমিশে ঢাকায় ক্যাসিনো ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন।

জিকে শামীম তাদের শক্তি ব্যবহার করে টেন্ডারবাজি করে বেড়াতেন। ক্যাসিনো পঞ্চপাণ্ডবের মধ্যে অমিল হচ্ছে- পাঁচজনের মধ্যে চারজন গ্রেফতার হয়েছেন, পদ হারিয়েছেন।

চলমান মাদক ও ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে সবশেষ গ্রেফতার হয়েছেন আলোচিত যুবলীগ নেতা ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার অন্যতম সহযোগী এনামুল হক আরমান।

এ অভিযানে বেশ কয়েকজন দাগি অপরাধী ধরা পড়লেও ক্যাসিনো সম্রাটের অন্যতম সহযোগী মমিনুল হক সাঈদ এখনও অধরা। তিনি ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের যুগ্ম সম্পাদক ও ওয়ার্ড যুবলীগের সাবেক সভাপতি।

রাজধানীতে মাদক ও ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ার পর গা ঢাকা দেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের ৯নং ওয়ার্ডের এ কাউন্সিলর।

ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি ইসমাইল হোসেন সম্রাটের (ক্যাসিনো সম্রাট) শিষ্য তিনি। ঢাকায় সম্রাটের অবৈধ ক্যাসিনো ব্যবসার দেখভাল করেন তিনি।

ক্যাসিনো সাঈদের উত্থান সম্পর্কে জানা যায়, তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে। পারিবারিক কলহের কারণে রাগ করে ২০০২ সালে তিনি ঢাকায় চলে আসেন। এর পর মতিঝিলের দিলকুশা সাধারণ বীমা কর্পোরেশনের সামনের সড়কে দোকানদারি শুরু করেন।

চোরাই তেলের ব্যবসাও করতেন। এর পর অবৈধ পথে সম্পদের পাহাড় গড়ে তোলেন। ঢাকায় বহু ভবন তার দখলে। মতিঝিল, ফকিরাপুল, পল্টনে কয়েকটি ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনো পরিচালনা করেন তিনি। এসব থেকে মাসে আয় কয়েক কোটি টাকা।

ক্যাসিনো সাঈদ থাকতেন বঙ্গভবনের চার নম্বর গেটের কোয়ার্টারে। সেখানে তার মামা চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর চাকরি করতেন। পরে মোহামেডান ক্লাবে হাউজি খেলার সময় আলমগীর ও তাপসের ফুটফরমায়েশ খাটতেন।

২০০৭ সালের পর যুবলীগের এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে তার সখ্য হয়। তার হাত ধরেই সাঈদ ৯ নম্বর ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি হন। পরে যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের যুগ্ম সম্পাদক হন। এর পর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতির পদ ছেড়ে দেন।

ওয়ার্ডে তার পদে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব দেয়া হয় হাসান উদ্দিন জামালকে। ক্যাসিনো সাঈদের সেকেন্ড-ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করতে থাকেন জামাল।

জামালের মাধ্যমেই আরামবাগ ক্লাব, দিলকুশা ক্লাব, ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো-জুয়ার আসর বসাতেন সাঈদ। এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ভবনে টেন্ডারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে জামালের পাশাপাশি কামরুল হাসান রিপন ছিল সাঈদের অংশীদার।

স্থানীয়রা জানান, মমিনুল হক সাঈদকে সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর বানানোর পেছনে রয়েছেন যুবলীগ মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট।

সম্রাটকে ম্যানেজ করেই তিনি কাউন্সিলর প্রার্থী হন। অন্য দলের যারা প্রার্থী ছিলেন তাদের বেশিরভাগকেই অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে প্রার্থিতা প্রত্যাহারে বাধ্য করেন। নিজ দলের যারা প্রার্থী ছিলেন তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করানো হয় টাকার বিনিময়ে।

কাউন্সিলর হওয়ার পর সাঈদের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যায়। জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর ভবন দখল করে গড়ে তোলেন টর্চার সেল।

তার হুকুম কেউ তামিল না করলেই টর্চার সেলে এনে নিপীড়ন করা হয়। এছাড়া কাউন্সিলর হয়ে সম্রাটের এজেন্ডা বাস্তবায়ন শুরু করেন সাঈদ। সম্রাটের ঢাকার ক্যাসিনোগুলো দেখভালের দায়িত্ব ছিল তার।

রাজধানীর বানিজ্যিক এলাকা মতিঝিলের ক্লাবপাড়ায় মোহামেডান, আরামবাগ, দিলকুশা, ওয়ান্ডারার্স, ভিক্টোরিয়া ও ফকিরেরপুল ইয়াংমেনস ক্লাবে অবৈধ ক্যাসিনোর ছড়াছড়ি।

এর মধ্যে ইয়াংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সম্রাটের শিষ্য খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া। বাকি পাঁচটি ক্লাবে ক্যাসিনো চালাতেন সম্রাটের লোকজন।

সম্রাটের ক্যাসিনোর দেখাশোনা করতেন ওয়ার্ড কাউন্সিলর মমিনুল হক ওরফে সাঈদ। তারা এক বছর আগে পল্টনের প্রীতম–জামান টাওয়ারে ক্যাসিনো চালু করেছিলেন। অভিযান শুরু হওয়ার পর মমিনুল সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমান।

গত ২৩ জুন বিনা অনুমতিতে মমিনুল হকের বিদেশ ভ্রমণ আটকাতে পুলিশের বিশেষ শাখার বিশেষ পুলিশ সুপারকে চিঠি দেয় ডিএসসিসি। অথচ কিছু দিন আগেও তিনি আবার বিনা অনুমতিতে সিঙ্গাপুরে গেছেন বলে জানিয়েছেন ডিএসসিসির সচিব মোস্তফা কামাল মজুমদার।

ক্যাসিনো সাঈদের সেকেন্ড-ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করতে থাকেন জামাল। জামালের মাধ্যমেই আরামবাগ, দিলকুশা ও ভিক্টোরিয়া ক্লাবে ক্যাসিনো-জুয়ার আসর বসাতেন সাঈদ।

এ ছাড়া বিআইডব্লিউটিএ ভবনে টেন্ডারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে জামালের পাশাপাশি কামরুল হাসান রিপন ছিল সাঈদের অংশীদার। সাঈদের বিরুদ্ধে ক্যাসিনোবাণিজ্যের পাশাপাশি চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজির অভিযোগও আছে।

ক্যাসিনোকাণ্ডে এ পর্যন্ত গ্রেফতার অভিযানে প্রায় সবার কাছে থেকে মোটা অংকের নগদ টাকা, অবৈধ অস্ত্র, স্বর্ণ, মাদক জব্দ করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

এ পর্যন্ত ৮ ক্যাসিনো হোতা আটক হলেও অধরা রয়ে গেছেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা আবু কাওসার ও কাউন্সিলর মমিনুল হক সাঈদ। এরা দুজন সম্রাটের ক্যাসিনো ব্যবসার দেখভাল করতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদের মধ্যে সাঈদ অভিযান শুরুর পর থেকে সিঙ্গাপুরে পলাতক। আর আবু কাওসার কিছু দিন দেশের বাইরে থেকে এখন ঢাকায় অবস্থান করছেন।

উল্লেখ্য, ১৪ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির সভায় চাঁদা দাবির অভিযোগে ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে শোভন ও রাব্বানীকে অপসারণের নির্দেশ দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

পাশাপাশি যুবলীগ নেতাদের বিষয়েও চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, যুবলীগের এক নেতা অস্ত্র উঁচিয়ে চলে। আরেকজন প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করে বেড়ায়।

এর পর গণমাধ্যমে যুবলীগ নেতাদের সংশ্লিষ্টতায় ঢাকার ৬০টি জায়গায় ক্যাসিনো পরিচালনার খবর প্রকাশ হয়। এর পরেই নড়ে চড়ে বসে গোটা প্রশাসন।

১৮ নভেম্বর ফকিরাপুলের ইয়াংমেনস, ওয়ান্ডারার্স এবং গুলিস্তানে মুক্তিযোদ্ধা ক্রীড়া সংসদে অভিযান চালিয়ে ক্যাসিনোর সরঞ্জাম, বিপুল পরিমাণ মদ ও ৪০ লাখের বেশি টাকা উদ্ধার করে র‍্যাব।

ক্যাসিনো পরিচালনার অভিযোগে ওই দিনই যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গ্রেফতার করা হয়, যিনি ইয়াংমেনস ক্লাবের সভাপতি ছিলেন।

পাশের ওয়ান্ডারার্স ক্লাব থেকেও জুয়ার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়। এ ক্লাব পরিচালনার নেতৃত্বে ছিলেন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওসার।

এর পর ধানমণ্ডির কলাবাগান ক্রীড়াচক্রে অভিযান চালিয়েও ক্যাসিনো চালানোর প্রমাণ পায় র‍্যাব। অস্ত্র-গুলি ও ইয়াবাসহ গ্রেফতার করা হয় ক্লাবের সভাপতি কৃষক লীগের সহসভাপতি শফিকুল আলম ফিরোজকে।

এর মধ্যে যুবলীগ নেতা পরিচয় দিয়ে ঠিকাদারি করা গোলাম কিবরিয়া শামীম ওরফে জিকে শামীমকে গ্রেফতার করা হয়। পরে গ্রেফতার করা হয় মোহামেডান ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ ও বিসিবির পরিচালক লোকমান ভূঁইয়াকে।

দুবাই থেকে গ্রেফতার করা হয় শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসানকে। পরে গ্রেফতার করা হয়েছে ক্যাসিনো সম্রাট যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটকে।

ক্যাসিনো ব্যবসায় যুবলীগ নেতাদের মদদ দেয়ার অভিযোগ উঠেছে যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরীর বিরুদ্ধে। এরই মধ্যে তার দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। তলব করা হয়েছে ব্যাংক হিসাব।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চলমান অভিযানকে 'শুদ্ধি অভিযান' নাম দিয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, বিভিন্ন অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ক্যাসিনো ব্যবসায়ীদের ভাসানচরে পাঠানো হবে।

বিজনেস আওয়ার/১৪ অক্টোবর, ২০১৯/এ

উপরে