sristymultimedia.com

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬


ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে মোবাইল টাওয়ার অপসারণে হাইকোর্টের রায়

১২:২৪পিএম, ১৭ অক্টোবর ২০১৯

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদকঃ মোবাইল ফোন কম্পানির টাওয়ার থেকে বেরোনো উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় (রেডিয়েশন) বিকিরণ স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় সব স্পর্শকাতর স্থান থেকে মোবাইল টাওয়ার দ্রুত সরিয়ে ফেলার নির্দেশনা দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট।

বৃহস্পতিবার (১৭ অক্টোবর) বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ও বিচারপতি মো. ইকবাল কবিরের সমন্বয়ে গঠিত রায় প্রদানকারী বেঞ্চের স্বাক্ষরের পর এ পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। রায়ে স্পর্শকাতর জায়গা বলতে ঘন জনবসতিপূর্ণ এলাকা ছাড়াও হাসপাতাল, স্কুল ও কলেজকে বোঝানো হয়েছে।

২০১৭ সালের মার্চে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া এক প্রতিবেদনে হাইকোর্টকে জানানো হয়, বাংলাদেশে মোবাইল ফোন কম্পানির টাওয়ার থেকে বেরোনো তেজস্ক্রিয় (রেডিয়েশন) বিকিরণ উচ্চমাত্রার। যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এ প্রেক্ষাপটে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা ওই বছরের ২৮ মার্চের মধ্যে আদালতকে জানাতে বিটিআরসিকে নির্দেশ দেওয়া হয়।

পরিবেশবাদী ও মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ'র (এইচআরপিবি) করা রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ওই প্রতিবেদন দেওয়া হয়। আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ। বিটিআরসির পক্ষে ছিলেন খন্দকার রেজা-ই-রাকিব।

হাইকোর্টের নির্দেশনার পর গঠিত কমিটি মতিঝিল, গুলশান ও মিরপুর এলাকায় ছয়টি মোবাইল কম্পানির ১৮টি টাওয়ারের (প্রতিটির তিনটি করে) তেজস্ক্রিয় বিকিরণ মাপে। এসব টাওয়ারের মধ্যে মাত্র একটিতে মাত্রাতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তা পাওয়া যায় বলে সাবকমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়। এ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বিশেষজ্ঞ কমিটি যে সুপারিশ তুলে ধরে তা গতকাল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আদালতে উপস্থাপন করে। ওই প্রতিবেদনে রেডিয়েশনের মাত্রা তুলে ধরা হয়।

এর আগে মোবাইল ফোন টাওয়ারের রেডিয়েশন নিঃসরণ নিয়ে ২০১২ সালে হাইকোর্টে রিট করে এইচআরপিবি। আদালত রেডিয়েশনের মাত্রা এবং এর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত প্রভাব খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন। বাংলাদেশ আণবিক শক্তি কমিশনের চেয়ারম্যানকে বিভিন্ন মোবাইল কম্পানির কয়েকটি টাওয়ার পরিদর্শন করে আদালতে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়। একই সঙ্গে সাত দিনের মধ্যে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি করতে স্বাস্থ্যসচিবকে নির্দেশ দেওয়া হয়। এই কমিটিতে বিজ্ঞানী, সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অধ্যাপক, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং আণবিক শক্তি কমিশনের প্রতিনিধিসহ সাতজন সদস্য রাখতে বলেন আদালত। এ কমিটিকে মোবাইল টাওয়ার থেকে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশগত প্রভাব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তিন মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। এসব অন্তবর্তীকালীন নির্দেশনার পাশাপাশি রুল জারি করা হয়। তাতে টাওয়ারগুলো থেকে নিঃসৃত রেডিয়েশন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বিবাদীদের কেন নির্দেশনা দেওয়া হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটি আলাদা একটি সাবকমিটি গঠন করে। এই সাবকমিটি ২০১৩ সালের ৩০ জুলাই প্রতিবেদন দেয় বিশেষজ্ঞ কমিটিকে। বিশেষজ্ঞ কমিটি তাদের সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়। সাবকমিটির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে সেলফোন ব্যবহারের হার দ্রুত বাড়ছে। ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিটিএস টাওয়ার স্থাপনের মাত্রা বেড়েছে। এর মধ্যে অধিকসংখ্যক টাওয়ার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় স্থাপিত হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, মোবাইল ফোন টাওয়ার থেকে বিকিরণ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বাংলাদেশে কোনো নীতিমালা বা গাইডলাইন এখনো হয়নি। ফলে ওপরের প্রতিবেদনে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য বিকিরণের নিরাপদ মাত্রা নির্ধারণের ক্ষেত্রে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসরণ করা হয়েছে।

তিন দফা সুপারিশ
সাবকমিটির প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে বিশেষজ্ঞ কমিটি তিনটি সুপারিশ পাঠায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে। তাতে বলা হয়-(ক) সাবকমিটি বিকিরণ পরিমাপকালে একটি মোবাইল অপারেটর বেইস ট্রান্সিভার স্টেশনে (বিটিএস) মাত্রাতিরিক্ত বিকিরণ পেয়েছে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই দেশের বিভিন্ন জায়গায় ছয়টি অপারেটর কর্তৃক স্থাপিত বিটিএসসমূহ পরীক্ষাপূর্বক বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারিত নিরাপদ মাত্রার মধ্যে বিকিরণ নামিয়ে আনার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বিটিআরসিকে বলা যেতে পারে।

(খ) নিয়মিতভাবে সকল মোবাইল ফোন অপারেটরের বিটিএসের বিকিরণ মনিটর করার জন্য বিটিআরসিকে বলা যেতে পারে। এবং (গ) বিটিএস স্থাপন ও এর টাওয়ার থেকে বিকিরণ নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত নীতিমালা বা গাইডলাইন অতিসত্বর প্রণয়ন করার জন্য ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসিকে বলা যেতে পারে।

এ সুপারিশ পাওয়ার পর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিটিআরসিকে রেডিয়েশনের মাত্রা কমাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেয়। এ অবস্থায় বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশসংবলিত প্রতিবেদন গতকাল হাইকোর্টে উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল। আদালত হলফনামা আকারে তা দাখিল করতে নির্দেশ দেন।

এরপর অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ আদালতে বলেন, আণবিক শক্তি কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে রেডিয়েশনের মাত্রা নিরূপণের জন্য যথেষ্ট সংখ্যক বিশেষজ্ঞ নেই। তাই তাঁরা সুনিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না কী মাত্রায় রেডিয়েশন হচ্ছে। এই আইনজীবী বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মাধ্যমে বিষয়টি পরীক্ষা করার নির্দেশনা চেয়ে আবেদন জানান।

বিজনেস আওয়ার/১৭ অক্টোবর, ২০১৯/আরআই

উপরে