sristymultimedia.com

ঢাকা, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর ২০১৯, ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬


অতিমূল্যায়িত দরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে এডিএন টেলিকম

১০:০৮এএম, ১৮ নভেম্বর ২০১৯

রেজোয়ান আহমেদ : বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কারসাঁজির মাধ্যমে অতিমূল্যায়িত হয়ে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর প্রায় শতভাগ এরইমধ্যে কাট-অফ প্রাইসের নিচে চলে এসেছে। এ অবস্থার মধ্যেই অতিমূল্যায়িত হওয়া আরেক কোম্পানি এডিএন টেলিকম শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হতে যাচ্ছে। তবে এ কোম্পানিতে স্বার্থ থাকার কারনে নিশ্চুপ ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ, ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ (ডিবিএ) অন্যান্য স্টেকহোল্ডাররা। কারন সবাই নিলামে অংশ গ্রহণের মাধ্যমে ওই কোম্পানিতে বিনিয়োগে জড়িয়ে পড়েছে।

সম্প্রতি আইপিও ইস্যুতে বেশ সোচ্চার ভূমিকা পালন করছে ডিএসইর পর্ষদ। এছাড়া পেছনে থেকে অগ্রনী ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে ডিবিএ। উভয় প্রতিষ্ঠানই আইপিওতে আসা কোম্পানিগুলোর নানা দূর্বলতা তুলে ধরার চেষ্টা করছে। এরই ধারাবাহিকতায় কপারটেক ইন্ডাস্ট্রিজ ইস্যুতে শক্ত ভূমিকা পালনের মাধ্যমে প্রশংসা কুড়িঁয়েছে ডিএসই। এমনকি রিং সাইনের আইপিওতে অস্তিত্বহীন পত্রিকার ভিত্তিহীন নিউজকে গুরুত্ব সহকারে নিয়েও কাজ করতে দেখা গেছে। একইসঙ্গে ভবিষ্যতে কোন দূর্বল এবং অসৎ কোম্পানি যেনো শেয়ারবাজারে আসতে না পারে, সে চেষ্টাও করে যাচ্ছে। যে লক্ষ্যে এরইমধ্যে একটি আইপিও রিভিউ টিম গঠন করেছে। কিন্তু সেই ডিএসইর পর্ষদ এডিএন টেলিকমের ক্ষেত্রে পুরো নিশ্চুপ। কোম্পানিটি অতিমূল্যায়িত দরে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার পথে থাকলেও তাদের কোন পদক্ষেপ নেই।

এডিএন টেলিকম শেয়ারবাজারে আসার প্রক্রিয়া শুরুর আগে ২০১৭ সালের ৭ জুন প্লেসমেন্টে প্রতিটি শেয়ার ১৫ টাকা করে ইস্যু করেছে। যে কোম্পানিটি বুক বিল্ডিং পদ্ধতির নিলামে প্রতিটি শেয়ার সর্বোচ্চ ১৭ টাকা দরে ইস্যু করার যোগ্যতা রাখে। তবে নিলামে যোগ্য নামের কারসাঁজিকর বিনিয়োগকারীরা সেটাকে ৩০ টাকায় মূল্যায়ন করেছে। এক্ষেত্রে কোম্পানিটি শুরুতেই ৭৬ শতাংশ অতিমূল্যায়ন নিয়ে শেয়ারবাজারে লেনদেনে নামবে। এই অতিমূল্যায়নের কারনে আগের কোম্পানিগুলো এখন কাট-অফ প্রাইস থেকে অনেক নিচে অবস্থান করছে। তবে ওইসব নামধারী যোগ্য বিনিয়োগকারীরা এখন সেইসব শেয়ারে আগ্রহ দেখায় না

শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বিজনেস আওয়ারকে বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা একটি কোম্পানির শেয়ারের যোগ্য দর মূল্যায়ন করে। আর আমাদের দেশে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা করে অতিমূল্যায়ন। যাদেরকে আমরা যোগ্য বিনিয়োগকারী বলি, প্রকৃতপক্ষে তারা অযোগ্য।

শেয়ারবাজারের স্বার্থে বুক বিল্ডিং পদ্ধতি ২০১৬ সালের শুরু থেকে চালু করা হলেও এরইমধ্যে তার অপব্যবহার পদ্ধতিটিতে কয়েক দফায় সংশোধনী আনা হয়েছে। সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই কমিশনের এক সভায় বিডারকে প্রস্তাবিত দরেই শেয়ার কেনা বাধ্যতামূলক করে সংশোধনীর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এক অনুষ্ঠানে বিএসইসির চেয়ারম্যান ড. এম খায়রুল হোসেন বলেন, প্রিমিয়ামের ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোর জন্য বুক বিল্ডিং সিষ্টেমস বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। কিন্তু বুক বিল্ডিং পদ্ধতির অপব্যবহার হচ্ছে। আর এই অপব্যবহার রোধে বিএসইসি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে বলে যোগ করেন।

বাংলাদেশের শেয়ারবাজারে যেকোন কোম্পানির শেয়ার দর বিবেচনায় ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিকে সর্বোচ্চ বিবেচনায় নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে প্রথমে কোম্পানির শেষ ৫ বছরের ওয়েটেড শেয়ারপ্রতি মুনাফাকে (ইপিএস) মূল্য-আয় অনুপাত (পিই রেশিও) ১০ দিয়ে গুণ করা হয়। এরপরে শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদ (এনএভিপিএস) যোগ করার পরে ২ দিয়ে ভাগ করে এই দর নির্ধারন করা হয়। এ পদ্ধতিতে এডিএন টেলিকমের শেয়ার দর হয় ১৭ টাকা।

এডিএন টেলিকমের রেড হেরিং প্রসপেক্টাস অনুযায়ি, কোম্পানিটির গত ৫ বছরের ওয়েটেড ইপিএস ১.৮১ টাকা। আর এনএভিপিএস রয়েছে ১৬.১৩ টাকা। এক্ষেত্রে কোম্পানিটির ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’পদ্ধতিতে শেয়ার দর মূল্যায়ন হয় ১৭.১২ টাকা।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে কাট-অফ প্রাইস নির্ধারনের জন্য এডিএন টেলিকমের বিডিং শুরু হয় গত বছরের ৫ নভেম্বর বিকাল ৫টায়। যা চলে টানা ৭২ ঘন্টা বা ৮ নভেম্বরের বিকাল ৫টা পর্যন্ত। এই নিলামে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার দর নির্ধারন করে ৩০ টাকা। তাদেরই মূল্যায়িত বুক বিল্ডিং পদ্ধতির আগের ৬টির মধ্যে ৫টি এখন কাট-অফ প্রাইসের নিচে।

২০১৬ সালে চালু হওয়ার পরে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে ৬টি কোম্পানি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এই কোম্পানিগুলোর শেয়ারে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা গড়ে ৬০.৬৭ টাকা কাট-অফ প্রাইস নির্ধারন করে। তবে কোম্পানিগুলোর বর্তমানে গড় বাজার দর নেমে এসেছে ৪২.৫৫ টাকায়। যা যোগ্য বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়িত দরের তুলনায় ১৮.১২ টাকা বা ২৯.৮৭ শতাংশ কম।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ারবাজারে আসা কোম্পানিগুলোর ইস্যু দর ও ১৬ নভেম্বরের বাজার দরের চিত্র তুলে ধরা হল-

যোগ্য বিনিয়োগকারীদের মূল্যায়িত ৬টি কোম্পানির মধ্যে ৫টির বা ৮৩ শতাংশ কোম্পানির শেয়ার দর এখন কাট-অফ প্রাইসের নিচে লেনদেন হচ্ছে। মাত্র ১টি কোম্পানির শেয়ার দর কাট-অফ প্রাইসের উপরে রয়েছে। তবে সেটাও কাট-অফ প্রাইসের কাছেই অবস্থান করছে।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতির আগে ইস্যু ম্যানেজাররা ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতির উপর ভিত্তি করে কোম্পানির শেয়ার ইস্যু করার জন্য বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনে (বিএসইসি) আবেদন করতেন। এবং এর আলোকে কমিশন প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন দিত। যদিও এখন প্রিমিয়ামে আসতে হলে বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে আসতে হয়। সেক্ষেত্রে দর নির্ধারনে যোগ্য বিনিয়োগকারীরা মূল ভূমিকা রাখেন। তবে এখনো কোম্পানিগুলোকে ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’পদ্ধতিতে দর গণনা করে দেখাতে হয়।

বুক বিল্ডিং পদ্ধতি চালুর আগে সব কোম্পানিকেই ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতির যোগ্যতার চেয়ে কম দরে প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) অনুমোদন দিয়েছে বিএসইসি। দেখা গেছে, ২০১৫ সালে ৮টি কোম্পানি প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করে। তবে সব কয়টি কোম্পানি ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিতে নির্ধারিত দরের চেয়ে কম দরে শেয়ার ইস্যু করেছে। এরমধ্যে রিজেন্ট টেক্সটাইল ৩১ টাকা পাওয়ার যোগ্য হলেও ২৫ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করে। এছাড়া সিমটেক্স ৩৩ টাকার বিপরীতে ২০ টাকায়, কেডিএস এক্সেসরিজ ৩৪ টাকার বিপরীতে ২০ টাকায়, আমান ফিড ৮৬ টাকার বিপরীতে ৩৬ টাকায়, তসরিফা ইন্ডাস্ট্রিজ ২৮ টাকার বিপরীতে ২৬ টাকায়, বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস ৬৬ টাকার বিপরীতে ৩৫ টাকায়, শাশা ডেনিমস ৫৪ টাকার বিপরীতে ৩৫ টাকায় এবং ইফাদ অটোস ৬৩ টাকার বিপরীতে ৩০ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করেছে।

এদিকে ২০১৬ সালে একমাত্র প্রিমিয়ামে শেয়ার ইস্যু করা ডরিন পাওয়ার জেনারেশন ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিতে ৩৭ টাকা পাওয়ার যোগ্য ছিল। তবে ২৯ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করার অনুমোদন পেয়েছে।

২০১৭ সালে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে বিবিএস ক্যাবলস ‘হিস্ট্রোরিকাল আর্নিংস বেজড ভ্যালু পার শেয়ার’ পদ্ধতিতে শেয়ারপ্রতি ৩২ টাকা পাওয়ার যোগ্য। এছাড়া নাহি অ্যালুমিনিয়াম ২৪ টাকা, ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডস ৩১ টাকা, প্যাসিফিক ডেনিমস ২০ টাকা, শেফার্ড ইন্ডাস্ট্রিজ ১৪ টাকা, নূরানি ডাইং অ্যান্ড সোয়েটার ১৩ টাকা পাওয়ার যোগ্য। তবে কোম্পানিগুলো শুধুমাত্র অভিহিত মূল্য ১০ টাকা দরে শেয়ার ইস্যু করার অনুমোদন পায়।

বিজনেস আওয়ার/১৮ নভেম্বর, ২০১৯/আরএ

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

বিদায়ী সপ্তাহে সব সূচকে পতন
ডিএসইতে লেনদেন কমেছে ৭’শ কোটি টাকা

উপরে