businesshour24.com

ঢাকা, বুধবার, ২৯ জানুয়ারি ২০২০, ১৬ মাঘ ১৪২৬


রেল দুর্ঘটনা, ইতিহাস বৃত্ত পর্যালোচনা

০৮:৪৪পিএম, ০৮ ডিসেম্বর ২০১৯

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রেল দুর্ঘটনা সমগ্র জাতিকে আবারো কাঁদালো, হৃদয় বিদারক দৃশ্যে বিভিন্ন মিডিয়ার মাধ্যমে দৃশ্যমান প্রতিবেদন দেখল সমগ্র জাতি। আবারো ঘটলো রেল দুর্ঘটনা বগি হল লাইনচ্যুত, ঘটে যাওয়া রেল দুর্ঘটনায় ক্ষতির পরিমাণ সম্পর্কে এখনো যথাযথ হিসাব পাওয়া না গেলেও সব মিলে ক্ষতি হয়েছে ২৮ কোটি ৩৪ লাখ ২৫৭ টাকার। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে রেলের যে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছে সেই তুলনায় আমরা বহুমাত্রিক গুনে পিছিয়ে। আমরা যদি বাস্তবতা একটু ভাবি দেখব, রেল দুর্ঘটনা পার্শ্ববর্তী দেশ ইন্ডিয়া কিংবা অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে অনেক বেশি সংঘটিত হয়। এক একটি দুর্ঘটনার একটি পরিবারের সারা জীবনের কান্না, এমনকি এমন নজির আছে পুরো পরিবার শেষ হয়েছে শুধুমাত্র একটি ভুলের জন্য, একজন দুইজন মানুষের ভুলের মাশুল গুনতে হয় হাজারো মানুষকে।

ট্রেন দুর্ঘটনা কারণ:

বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক শামসুল হকের মতে,” আমাদের নজর উন্নয়নের দিকে কিন্তু মেরামত যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সেদিকে বাজেটও কমে যাচ্ছে, বৃটিশ আমলের রেললাইন নিয়মিত সংস্কার করা প্রয়োজন, সেগুলোর কি হচ্ছে?পাশাপাশি অনেকদিন ধরেই রেলে জনবল কম। এটা অন্য সেক্টরের মতো না। একজনকে নিয়োগ দিলে, তাকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজে লাগাতে সময় লাগে। ট্রেন কেন এত লাইনচ্যুত হচ্ছে? এত বেশি দুর্ঘটনার কারণ ব্রিটিশ আমলের রেলপথকে তো খুব একটা গুরুত্বের সঙ্গে কখনো নেওয়া হয়নি। আগে মানুষ ট্রেনে চড়তে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতো না। এখন অনেক বেশি মানুষ ট্রেনে চড়ে।১৯৭৩ সালে রেলে জনবল ছিল ৬৮ হাজার। তখন দেশের মানুষ ছিল ৭ কোটি । এখন প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে রেলের জনবল ২৭ হাজার। দেশে সিঙ্গেল লাইনে ট্রেন চলে, ফলে কোথাও দুর্ঘটনা ঘটলে পুরো এলাকার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এটা যতদিন না ডাবল লাইন করা যাচ্ছে, ততদিন এই সমস্যা বিদ্যমান থাকবে। রেলের বড় কর্তাদের একটা বড় অংশের মনোযোগ এখন উন্নয়ন প্রকল্পে। কারণ, সেখানে প্রচুর পয়সা আছে। ফলে দৈনন্দিন ট্রেন পরিচালনায় তাঁদের মনোযোগ কম। অন্যদিকে গত এক দশকে নিচের দিকে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। যাদের একটা বড় অংশের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি। এদের একটা বড় অংশ পয়সা দিয়ে চাকরি পেয়েছে। ফলে নিজের দায়িত্বটা ঠিকভাবে পালন করছে না।

ট্রেন দুর্ঘটনার সমাধান করণ:

রেল দুর্ঘটনার ৮০ শতাংশের বেশি ঘটছে কর্মীদের ভুলে ও অবহেলায়। গত পাঁচ বছরের দুর্ঘটনা বিশ্লেষণ করে দুর্ঘটনার দুটি কারণ পাওয়া যায়।
১.মানবিক ভুল
২.কারিগরি ত্রুটি।

গড়ে ৮০% ভুলের মধ্যে রয়েছে লাইন পরিবর্তনের জোড়া ভুলভাবে স্থাপন করা ও ভুল সংকেত দেওয়া। সংকেত ও গতিনির্দেশিকা না মেনে ট্রেন চালান চালক ও সহকারী চালকেরা। কারিগরি ত্রুটির মধ্যে লাইনের ত্রুটি, ইঞ্জিন-কোচের ত্রুটি, মানুষের ভুল এড়ানো সম্ভব এইজন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।

রেলওয়ে বলেছে, রেলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সর্বোচ্চ কারিগরি নিরাপত্তার বিধান করা আছে। কর্মীরা সেই কাজটিই মানছে না। পুরকৌশল বিভাগের দায়িত্ব হচ্ছে লাইনে ত্রুটি হলে সেটা যথাযথভাবে মেরামত করা এবং স্টেশনমাস্টার,এমনকি চালককেও সেটা জানানোর কথা। রেল পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের ‘রানিং স্টাফ’ বলা হয়। এর মধ্যে চালক, সহকারী চালক, পরিচালক (গার্ড), স্টেশনমাস্টার রয়েছেন। এঁদের প্রত্যেককে বাধ্যতামূলক ডোপ টেস্ট (মাদক পরীক্ষা) করার নিয়ম বাস্তবায়ন করতে হবে।

বাংলাদেশের ইতিহাসে রেল দুর্ঘটনার একটি চিত্র তুলে ধরা হলো:

## বাংলাদেশের ইতিহাসে দেশে সবচেয়ে ভয়াবহ ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল ১৯৮৯ সালের ১৫ জানুয়ারি টঙ্গীর মাজুখানে দুটি ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষে ১৭০ জন যাত্রী নিহত হন, আরও ৪০০ যাত্রী আহত হয়।
## ১৯৮৩ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামের কাছাকাছি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে ১৩ জন নিহত হন ও ২০০ জন আহত হয়।
## ১৯৮৩ সালের ২২শে মার্চ ঈশ্বরদীর কাছে সেতু পার হওয়ার সময় কয়েকটি স্প্যান ভেঙে পড়ে। নিচে শুকনো জায়গায় গিয়ে পড়ে ট্রেনের কয়েকটি বগি। এতে ৬০ জন যাত্রী নিহত হয়।
## ১৯৮৫ সালের ১৩ই জানুয়ারি খুলনা থেকে পার্বতীপুরগামী সীমান্ত এক্সপ্রেসের কোচে আগুন ধরে যায়। এতে ২৭ জন যাত্রী নিহত হন এবং ২৭ জন আহত হন।
## ১৯৮৬ সালের ১৫ই মার্চ সর্বহারা পার্টির নাশকতায় ভেড়ামারার কাছে ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে নদীতে পড়ে যায়। এতে ২৫ জন যাত্রী নিহত হন এবং ৪৫ জন আহত হন।
## ১৯৯৫ সালের ১৩ই জানুয়ারি রাত সোয়া ৯টায় হিলি স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা গোয়ালন্দ থেকে পার্বতীপুরগামী লোকাল ট্রেনকে ধাক্কা দেয় সৈয়দপুর থেকে খুলনাগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস। এতে দু'টি ট্রেনের ৫০ জনের বেশি যাত্রী নিহত হন। আহত হন দুই শতাধিক যাত্রী।
## ২০১০ সালে নরসিংদীতে চট্টগ্রামগামী মহানগর গোধূলি এবং ঢাকাগামী চট্টলা এক্সপ্রেসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। চালকসহ মোট ১২ জন নিহত হয়।
##২০১৬ সালে নরসিংদীর আরশীনগর এলাকায় ঢাকা থেকে ছেড়ে যাওয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়াগামী তিতাস কমিউটার ট্রেনের ইঞ্জিন লাইনচ্যুত হয়। দুর্ঘটনার কারন ছিল ভুল সিগন্যাল এতে দুইজন নিহত ও অন্তত ১০ আহত হয়।
## ২০১৮ সালের ১৫ই এপ্রিল টঙ্গীতে ঢাকা-জয়দেবপুর রেললাইনে একটি ট্রেনের ৫টি বগি লাইনচ্যুত হলে ৫ জন নিহত ও ৫০ জন আহত হয়।
## ২০১৯ সালের ২৩শে জুন কুলাউড়ার বরমচাল রেলক্রসিং এলাকায় সিলেট থেকে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেসের ৪টি বগি লাইনচ্যুত হয়ে খালে ছিটকে পড়ে। এতে ৬ যাত্রী নিহত হয়।
## সবশেষ গেল ১২ই নভেম্বর- ২০১৯ ভোররাত পোনে ৩টার দিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মন্দবাগ রেল স্টেশনে সিলেট থেকে চট্টগ্রামগামী উদয়ন এক্সপ্রেসের পেছনের কয়েকটি বগিকে ধাক্কা দেয় চট্টগ্রাম থেকে আসা তূর্ণা নিশীথা এক্সপ্রেস। এখন পর্যন্ত ১৬ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত। আহত হয়েছেন শতাধিক যাত্রী।

রেল দুর্ঘটনার ভয়াবহতা বিশ্বময়:

>> ১৯১৭ সালে রোমানিয়ার সিউরেয়া স্টেশনের নিকটবর্তী এলাকায় একটি ট্রেনে আগুন ধরে গেলে অন্তত ছয় শত যাত্রী নিহত হয়।
>> ১৯৪৪ সালের ৩ জানুয়ারি স্পেনের টরে ডেল বিয়েরজু গ্রামে অবস্থিত ২০ নাম্বার টানেলে একটি মেইল ট্রেইন প্রবেশ করে। এসময় বিপরীত দিক থেকে কয়লাবাহী আরেকটি ট্রেনের সাথে মুখোমুখি ধাক্কা লাগে ট্রেন দুটিতে বেশ কিছু যাত্রী থাকলেও তারা টিকেট ছাড়াই ভ্রমণ করছিল। যে করণে হতাহতের সঠিক সংখ্যা জানা যায়নি। ট্রেন দুটিতে টানা দু’দিন ধরে আগুন জ্বলেছিল।
>>১৯৮১ সালের প্রায় ১০০০ যাত্রী নিয়ে বিহারের বাঘমতি নদীতে পড়ে যায় একটি ট্রেন। টেনটি যখন সেতুর কাছে এসেছিল ঠিক সেই মুহূর্তে একটি গরু ট্রেনলাইন পার হচ্ছিল। গরুটিকে বাচানোর চেষ্টা করতে গেলে রেলের নিয়ন্ত্রণ হারায় চালক। পাঁচ শতের অধিক যাত্রী নিহত হয়েছিল এ দুর্ঘটনায়।
>> ইথিওপিয়ার আওয়াশ শহরের নিকটে ১৪ জানুয়ারি ১৯৮৫ সালের ট্রেন দুর্ঘটনাটি আফ্রিকার ভয়াবহতম দুর্ঘটনা হিসেবেই পরিচিত। আওয়াশ গিরিখাতের পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়ে খাদে পড়ে গেলে ৪২৮ জন নিহত হয়।
>>১৯১৭ সালের ১২ ডিসেম্বর। প্রচণ্ড গতির কারণে আল্পস পর্বতের পাশ দিয়ে যাওয়া ফ্রান্সের সেইন্ট মিশেল-ডে-মাউরিএনে রেল দুর্ঘটনাই সৈন্যবাহী একটি ট্রেনের ব্রেকে আগুন ধরে যায়। ধারণা করা হয় এ দুর্ঘটনায় যাত্রীদের সবাই নিহত হয়।
>> ২০০২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি মিশরের কায়রো থেকে লুক্সরগামী ট্রেনের একটি বগিতে গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণ ঘটে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে ট্রেনের অন্যান্য বগিতে এবং ট্রেনটির সাতটি বগি পুড়ে নিহত হয় কমপক্ষে ৪০০ জন মানুষ।
>> ২০০৪ সালের সুনামির দিনে প্রায় ১৫ শত যাত্রী নিয়ে সমুদ্র থেকে মাত্র ২১৭ গজ দুরে অবস্থান করছিল একটি ট্রেন। সুনামির প্রথম ঢেউটি আসার সময়ে স্টেশনের আরো অনেক যাত্রী ট্রেনটিকে নিরাপদ ভেবে আশ্রয় নেয়। ১৭০০ জনের অধিক মানুষ এ ট্রেন দুর্ঘটনায় নিহত হয়।
বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বের দুর্ঘটনা থেকে তেমন একটা শিক্ষা নেওয়ার দৃশ্যমান কর্মকাণ্ড খুব একটা চোখে পড়ে না। রেলে অবকাঠামোগত উন্নয়নে যে পরিমাণ বিনিয়োগ করা হয় সে অনুপাতে সফলতা দৃশ্যমান নয়। সুদূর প্রসারী পরিকল্পনার মাধ্যমে রেল হতে পারে আমাদের অন্যতম একটি যোগাযোগ মাধ্যম ও সরকারি আয়ের অন্যতম উৎস।

মোঃ সবুর মিয়া
Email: [email protected]

বিজনেস আওয়ার/৮ ডিসেম্বর, ২০১৯/আরআই

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

উপরে