ঢাকা, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬


করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বাগেরহাটে কাঁকড়া শিল্পে

১১:৫৯এএম, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক (খুলনা) : চীনে করোনাভাইরাসের প্রভাব পড়েছে বাগেরহাটের কাঁকড়া শিল্পে। রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে ঘেরে থাকার কারণে কাঁকড়াগুলো মরে যাচ্ছে। বিশেষ করে ডিমওয়ালা মা কাঁকড়া বেশি মারা পড়ছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন ঘেরের ৭০ শতাংশ কাঁকড়া মারা গেছে।

কাকড়া ব্যবসায়ী ও চাষিরা বলেন, বাগেরহাটে দেড় শ' কোটি টাকা মূল্যের কাঁকড়া মারা গেছে। আর চীনে রপ্তানি করা কাঁকড়ার মূল্য বাবদ অনেক ব্যবসায়ীর কোটি টাকা পর্যন্ত আটকা পড়েছে। এ অবস্থায় কাঁকড়া রপ্তানির জন্য নতুন আন্তর্জাতিক বাজার খোঁজার দাবি করছেন তারা।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘেরের পাড়ে স্তুপ করে রাখা হয়েছে মৃত কাঁকড়া। চাষিরা ঘের থেকে কাঁকড়া তুলে পাড়ে ফেলছেন। ঘেরের পানিতে পা ফেলতেই পাচ্ছেন মরা কাঁকড়া। আর বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। একইভাবে বাজারে কাঁকড়া ক্রয় কেন্দ্রগুলোতে দেখা গেছে, কাঁকড়ার ঝুড়ি প্রায় শূন্য। বাজারে কাঁকড়ার সরবারহ নেই বললেই চলে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, লাভজনক হওয়ায় বাগেরহাটের চাষিরা কাঁকড়া চাষে ঝুঁকেন। এতে মৎস্য বিভাগও উৎসাহিত করায় একের পর এক ঘের ও চাষির সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ জেলায় সাধারণত দুভাবে কাঁকড়া চাষ হয়। এর মধ্যে সুন্দরবন এবং পাশ্ববর্তী বিভিন্ন নদী-খাল থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে ঘেরে মজুত রাখা হয়।

এছাড়া বাচ্চা কাঁকড়া ঘেরে ছেড়ে বড় করা হয়। এখানকার কাঁকড়া দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজার দখল করে নিয়েছে। তবে বিগত কয়েক বছরে কাঁকড়ার বড় বাজার তৈরি হয় চীনে।

এ ব্যাপারে বাগেরহাটের কাঁকড়া ব্যবসায়ী সাধন কুমার সাহা বলেন, দেশে উৎপাদিত শতকরা ৮৫ ভাগ কাঁকড়া চীনে রপ্তানি করা হয়। আর সামান্য পরিমাণ কাঁকড়া তাইওয়ান, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরে যায়। প্রতি মাসে গড়ে ২০০ টন কাঁকড়া রপ্তানি হয়। ওই কাঁকড়া আন্তর্জাতিক বাজারে প্রায় ১৫-২০ কোটি টাকায় বিক্রি হয়।

তিনি আরও বলেন, সর্বশেষ গত ২২ জানুয়ারি তার কাঁকড়া চীনে রপ্তানি হয়। এরপর থেকে বন্ধ রয়েছে। তার নিজের রপ্তানি করা কাঁকড়ার মূল্য বাবদ ৫০ লাখ টাকার ওপরে আটকা পড়ে আছে।

ব্যবসায়ী সাধনের দেয়া তথ্যমতে, রপ্তানি বন্ধ থাকার কারণে ঘেরের শতকরা ৭০ ভাগ কাঁকড়া মারা গেছে। আর যা আছে তাও কয়দিন থাকলে মারা যাবে। চলমান পরিস্থিতিতে জেলায় এ শিল্পের সাথে জড়িত ৫০ হাজার ব্যবসায়ী, জেলে এবং শ্রমিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

মাঝিডাঙ্গা গ্রামের বেশ কয়েকজন চাষি জানান, ২৫ দিন আগে থেকে ঘেরে কাঁকড়া মরা শুরু হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার কাঁকড়া মরছে। বাজারে এক মাস আগে যে এক কেজি কাঁকড়া ১২০০-১৪০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে তা এখন মাত্র ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

শরণখোলা উপজেলার সোনাতলা গ্রামের চাষি পলাশ মাহমুদ জানান, আড়াই থেকে তিন মাসের মধ্যে কাঁকড়া পূর্ণাঙ্গ রূপ নেয়। এর মধ্যে বিক্রি না হলে এমনিতেই মরে যায়। কারণ এ সময় মা কাঁকড়ার পেট ডিমে পরিপূর্ণ থাকে। ডিম ছাড়া এবং খোলস পরিবর্তনের জন্য কাঁকড়াদের সাগর ও নদ-নদীতে চলে যেতে হয়। কিন্তু বদ্ধ জায়গায় থাকলে তারা মারা পড়ে।

জেলা মৎস্য অফিসের তথ্যমতে, বাগেরহাটে তিন হাজার ৭৪৮ জন কাঁকড়া চাষি রয়েছেন। আর এক হাজার ৪১০ হেক্টর জমিতে তিন হাজার ৭৭৮টি কাঁকড়ার ঘের রয়েছে। এগুলোতে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দুই হাজার ৬২৯ মেট্রিক টন কাঁকড়া উৎপাদন হয়।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. খালেদ কনক বলেন, ঘেরে ধারণ ক্ষমতার অতিরিক্ত কাঁকড়া মজুত ও লবণাক্ততার কারণে কাঁকড়া মারা যাচ্ছে। এ জন্য বিভিন্ন উপজেলায় সচেতনতামূলক সভা করা হয়েছে। যে সব ঘেরে অতিরিক্ত কাঁকড়া মজুত আছে তা সরিয়ে অন্য জলাশয়ে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। একই সাথে কাঁকড়ার নতুন বাজার খোঁজার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

বিজনেস আওয়ার/২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২০/এ

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

উপরে