ঢাকা, সোমবার, ৩০ মার্চ ২০২০, ১৬ চৈত্র ১৪২৬


বন্ধু হত্যার মিথ্যে অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম

০৩:০৩পিএম, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০

বিনোদন ডেস্ক : ঢাকাই ছবির তুমুল জনপ্রিয় নায়ক সালমান শাহ হত্যাকাণ্ডের শিকার হননি। বরং পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছিলেন বলে জানিয়েছে তদন্ত সংস্থা পিবিআই। সোমবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরে এ তথ্য জানান পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার।

প্রতিবেদনে পিবিআই প্রধান বনজ কুমার মজুমদার বলেন, পিবিআই কর্তৃক তদন্তকালে ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৪৪ সাক্ষীর জবানবন্দি ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬১ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়। ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় লিপিবদ্ধ করা হয়।

পাশাপাশি ঘটনা সংশ্লিষ্ট আলামত জব্দ করা হয়। এসব বিষয় পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, চিত্রনায়ক সালমান শাহ পারিবারিক কলহের জেরে আত্মহত্যা করেছেন। হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ মেলেনি। এর ফলে সালমান খুনে অভিযুক্তরা সব দায় থেকে মুক্ত হলেন।

পিবিআইয়ের এই প্রতিবেদনে সন্তোষ প্রকাশ করে সালমান হত্যা মামলার অন্যতম আসামি অভিনতা ডন। তিনি বলেন, আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। অবশেষে কলিজার বন্ধুকে হত্যার মিথ্যে অভিযোগ থেকে মুক্ত হলাম। আমি সবসময়ই আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ছিলাম।

গত ২৪টা বছর বুকের ভেতর বন্ধু হত্যার মিথ্যা অপবাদ আমাকে নিয়ে ঘুরতে হয়েছে। আমি ধৈর্য ধরে ছিলাম। সত্য কোনোদিন মিথ্যে হয় না। আর মিথ্যেকেও কোনোদিন সত্যি বানানো যায় না। সালমান শাহ ছিল আমার কলিজার বন্ধু। এটা এই ইন্ডাস্ট্রির সবাই জানে। তার মৃত্যুতে কিন্তু আমারই সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হলো।

নায়ক-ভিলেন হিসেবে আমাদের যে জুটি ছিল সেটি তরুণদের কাছে অনেক অনেক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। সালমান চলে যাবার পর আমিও আর সিনেমায় তেমনভাবে নিয়মিত হতে পারিনি। তবু আমার ওপর বন্ধু খুনের মিথ্যে দায় চাপানো হলো। কত কষ্ট, জ্বালা-যন্ত্রণা আমি সয়েছি সেটা আমিই কেবল জানি।

পিবিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ডন বলেন, আইন যা বলে তার উপরে কারোর কিছু করার নেই। সালমান হত্যার তদন্তের জন্য অনেক তদন্ত হয়েছে। সর্বশেষ পিবিআই তদন্ত করলো। তারা অনেক সময় কাজটি করেছে। আমাকেও ডেকেছিলেন দুই মাস আগে। গিয়েছি। জবানবন্দী দিয়েছি।

সংশ্লিষ্ট সবাইকেই তারা তলব করা হয়েছে বলেও আমি শুনেছি। তার ভিত্তিতে এই আত্মহত্যার প্রতিবেদন এলো। আমি দেশের আইন ব্যবস্থা এবং পিবিআইয়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। সুষ্ঠু-সুন্দরভাবে দুই যুগ ধরে চলে আসা একটি রহস্যের মীমাংসা তারা করেছেন।

সালমান শাহ এই দেশের মানুষের কাছে একটি আবেগের নাম। মৃত্যুর এতগুলো বছর পেরিয়েও সে সবার কাছে জীবন্ত। আমি বহুবার ভেবেছি যদি এমন হতো মীরাকল ঘটে গেছে একটা। সালমান ফিরে এসেছে। আবার দুজন সিনেমা করতাম। এ দেশের মানুষ জানতো সালমান আমাকে কতোটা ভালোবাসে।

কিন্তু এ তো কেবলই কল্পনা। সালমান আসেনি, আসবেও না। আমার বন্ধুকে যেন আল্লাহ ওপারে ভালো রাখে সেই দোয়া চাই সবার কাছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মারা যান চিত্রনায়ক সালমান শাহ। এ ঘটনায় তখন অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করেন তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী (প্রয়াত)। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই ছেলেকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত করার আবেদন জানান তিনি।

অপমৃত্যু মামলার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের অভিযোগের বিষয়টি একসঙ্গে তদন্ত করতে অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) নির্দেশ দেন আদালত। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। চূড়ান্ত প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করা হয়।

২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন গৃহীত হয়। সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রিভিশন মামলা দায়ের করেন। ২০০৩ সালের ১৯ মে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান আদালত। এরপর প্রায় ১৫ বছর মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে ছিল।

২০১৪ সালের ৩ আগস্ট ঢাকার সিএমএম আদালতের বিচারক বিকাশ কুমার সাহার কাছে বিচার বিভাগীয় তদন্তের প্রতিবেদন দাখিল করেন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইমদাদুল হক। এ প্রতিবেদনে সালমান শাহের মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী ছেলের মৃত্যুতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেন।

২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী ঢাকা মহানগর হাকিম জাহাঙ্গীর হোসেনের আদালতে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনের বিষয়ে নারাজির আবেদন দাখিল করেন। নারাজি আবেদনে উল্লেখ করা হয়, আজিজ মোহাম্মদ ভাইসহ ১১ জন তার ছেলে সালমান শাহের হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন।

এরপর মামলাটি র‍্যাব তদন্ত করে। তবে র‍্যাবের দ্বারা তদন্তের আদেশের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ গত বছরের ১৯ এপ্রিল মহানগর দায়রা জজ আদালতে একটি রিভিশন মামলা করে। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ ৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েস রাষ্ট্রপক্ষের রিভিশনটি মঞ্জুর করেন এবং র‍্যাবকে মামলাটি আর তদন্ত না করার আদেশ দেন।

তারপর মামলাটির তদন্তভার যায় পিবিআইয়ের হাতে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি এ মামলার পুনঃতদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার কথা ছিল। পিবিআই ওই তারিখে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় ঢাকা মহানগর হাকিম বাকী বিল্লাহ পুনঃতদন্ত প্রতিবেদনটি ১৮ মার্চ জমা দেয়ার আদেশ দেন।

আর সেই তারিখ আসার আগেই সোমবার (২৪ফেব্রুয়ারি) পিবিআই সদরদফতরে সংবাদ সম্মেলন ডেকে চাঞ্চল্যকর এ মামলার তদন্ত ও ফলাফলের বিস্তারিত ধরে।

বিজনেস আওয়ার/২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২০/এ

এই বিভাগের অন্যান্য খবর

উপরে