ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ জুন ২০১৯, ৫ আষাঢ় ১৪২৬
sristymultimedia.com

প্রচ্ছদ » ধর্ম » বিস্তারিত


eid-ul-fitor-businesshour24

ss-steel-businesshour24

Runner-businesshour24

শবে মেরাজের বর্ণনা

আপডেট : 2019-01-15 09:20:30
শবে মেরাজের বর্ণনা

বিজনেস আওয়ার ডেস্কঃ নবী করিম (সা.) এর মোজেজাসমূহের মধ্যে মেরাজ গমন একটি বিস্ময়কর মোজেজা। এ জন্যই মেরাজের ঘটনা বর্ণনা করার আয়াতের শুরুতেই আল্লাহ্ পাক ‘সুবহানআল্লাহ’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, যা আশ্চর্যজনক ঘটনার সময়ই ব্যবহার করা হয়। সশরীরে মেরাজ গমনের প্রমাণস্বরূপ কোরআনের ‘বিআব্দিহী’ শব্দটি তাৎপর্যপূর্ণ। কেননা ‘আব্দুন’ শব্দটি দ্বারা বুঝানো হয় রুহ ও দেহের সমষ্টিকে। তদুপরি বোরাক প্রেরণ ও বোরাক কর্তৃক নবী করিম (সা.)কে বহন করে নিয়ে যাওয়ার মধ্যেও সশরীরে মেরাজ গমনের প্রমাণ পাওয়া যায়। স্বপ্নে বা রুহানীভাবে মেরাজের দাবি করা হলে কোরাঈশদের মধ্যে এতো হৈ চৈ হতো না। আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাআতের পূর্ববর্তী সকল ইমামগণই সশরীরে মেরাজ গমনের কথা স্বীকার করেছেন।

মিরাজের ঘটনাটি নবীজির (সা.) জীবনে গুরুত্বপূর্ণ এজন্য যে, এর সঙ্গে গতির সম্পর্ক এবং সময় ও স্থানের সঙ্কোচনের তত্ত্ব জড়িয়ে আছে। সূর্যের আলোর গতি সেকেন্ডে একলক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। পৃথিবীতে সূর্যের আলো পৌঁছাতে সময় লাগে আট মিনিট বিশ সেকেন্ড। এ হিসেবে পৃথিবী হতে সূর্যের দূরত্ব নয় কোটি তিরিশ লক্ষ মাইল। অথচ নবী করিম (সা.) মুহূর্তের মধ্যে চন্দ্র, সূর্য, সিদরাতুল মোন্তাহা, আরশ-কুরছি ভ্রমণ করে লা-মাকানে খোদার দীদার লাভ করে নব্বই হাজার কালাম করে ফের মক্কা শরীফে ফিরে এলেন। এসে দেখলেন বিছানা তখনো গরম রয়েছে। এর চেয়ে আশ্চর্য আর কি হতে পারে? নবী করিম (সা.) এর গতি কত ছিল– এ থেকেই অনুমান করা যায়। কেননা তিনি ছিলেন নূর।

মেরাজের মধ্যে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্যান্য নবীর সমস্ত মোজেজা নবী করিম (সা.) এর মধ্যে একত্রিত হয়েছিল। হযরত মুসা (আঃ) তুর পর্বতে খোদার নামে কালাম করেছেন। হযরত ঈছা (আঃ) সশরীরে আকাশে অবস্থান করেছেন এবং হযরত ইদ্রিছ (আঃ) সশরীরে বেহেস্তে অবস্থান করছেন। তাদের চেয়েও উন্নত মকামে বা উচ্চমর্যাদায় আল্লাহ্ পাক নবী করিম (সা.)কে নিয়ে সবার উপরে তাকে মর্যাদা প্রদান করেছেন। মুসা (আঃ) নিজে গিয়েছিলেন তুর পর্বতে। আর আমাদের প্রিয় নবী করিম (সা.)কে আল্লাহ্ তা’আলা দাওয়াত করে বোরাকে চড়িয়ে ফেরেস্তাদের মিছিল সহকারে বায়তুল মোকাদ্দাছে নিয়েছিলেন। সেখানে সমস্ত নবীগণকে সশরীরে উপস্থিত করে হুজুর করিম (সা.) এর মোক্তাদী বানিয়েছিলেন। সেদিনই নবীগণের ইমাম হতে নবী করিম (সা.) ‘নবীগণেরও নবী’ বাস্তবে প্রমাণিত হয়েছিলেন। নবীগণ অষ্ট অঙ্গ (দুই হাত, দুই পা, দুই হাটু, নাক ও কপাল) দিয়ে সশরীরে নামাজ আদায় করেছিলেন সেদিন। নবীগণ সশরীরে জীবিত, তারই বাস্তব প্রমাণ মিলেছিল মেরাজের রাতে।

নবীগণ আপন আপন রওযায় জীবিত আছে…হাদিস মেরাজের রাতে নবী করিম (সা.)কে প্রথম সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল জিব্রাইল, মিকাইল ও ইস্রাফিল ফেরেস্তাত্রয়ের অধীনে সত্তর হাজার ফেরেস্তা দিয়ে। দ্বিতীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল নবী (আঃ) গণের মাধ্যমে। তৃতীয় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল আকাশের ফেরেস্তা ও হুর দিয়ে এবং চতুর্থ ও শেষ সংবর্ধনা দিয়েছিলেন স্বয়ং আল্লাহ্ তাআলা। সিদ্রাতুল মোন্তাহা ও আরশ মোয়াল্লা অতিক্রম করার পর স্বয়ং আল্লাহ তাআলা একশত বার সংবর্ধনামূলক বাক্য ادن منى يا محمد অর্থাৎ ‘হে প্রিয় বন্ধু মোহাম্মদ, আপনি আমার অতি নিকটে আসুন’– বলে নবী করিম (সা.)কে সম্মানিত করেছিলেন। কোরআন মজিদে ثُمَّ دَنَا فَتَدَ لَّى আয়াতটি এদিকেই ইঙ্গিতবহ বলে তাফসীরে মুগ্নী ও মিরছাদুল ইবাদ গ্রন্থদ্বয়ের বরাত দিয়ে রিয়াজুন্নাছেহীন কিতাবে উল্লেখ করা হয়েছে। উক্ত কিতাবখানা সাত শত বছর আগে ফারসি ভাষায় লিখিত।

মিরাজের ঘটনা ঘটেছিল ১১ বছর ৫ মাস ১৫ দিনের মাথায়। অর্থাৎ প্রকাশ্য নবুয়তের ২৩ বছর দায়িত্ব পালনের মাঝামাঝি সময়ে। সে সময় হুজুর (সা.) এর বয়স হয়েছিল ৫১ বছর ৫ মাস ১৫ দিন। সন ছিল নবুয়তের দ্বাদশ সাল। তিনটি পর্যায়ে মেরাজকে ভাগ করা হয়েছে। মক্কা শরীফ থেকে বায়তুল মোকাদ্দাছ পর্যন্ত মেরাজের অংশকে বলা হয়ে ইস্রা বা রাত্রি ভ্রমণ। বায়তুল মোকাদ্দাছ থেকে সিদ্রাতুল মোন্তাহা পর্যন্ত অংশকে বলা হয় মেরাজ। সিদ্রাতুল মোন্তাহা থেকে আরশ ও লা-মকান পর্যন্ত অংশকে বলা হয় ই’রাজ; কিন্তু সাধারণভাবে পূর্ণ ভ্রমণকেই এক নামে মেরাজ নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। কোরআন, হাদিসে মোতাওয়াতির এবং খবরে ওয়াহে দ্বারা যথাক্রমে এই তিনটি পর্যায়ের মিরাজ প্রমাণিত।

মিরাজের প্রথম পর্যায়

রজব চাঁদের ২৭ তারিখ সোমবার পূর্ব রাত্রের শেষাংশে নবী করিম (সা.) বায়তুল্লায় অবস্থিত বিবি উম্মেহানী (রাঃ) এর ঘরে অবস্থান করছিলেন। বিবি উম্মেহানী (রাঃ) ছিলেন আবু তালেবের কন্যা এবং নবী করিম (সা.) এর দুধবোন। উক্ত গৃহটি ছিল বর্তমান হেরেম শরীফের ভিতরে পশ্চিম দিকে। হযরত জিবরাইল (আঃ) ঘরের ছাদ দিয়ে প্রবেশ করে নূরের পাখা দিয়ে, অন্য রেওয়ায়েত মোতাবেক-গণ্ডদেশ দিয়ে নবী করিম (সা.) এর কদম মোবারকের তালুতে স্পর্শ করতেই হুযুরের তন্দ্রা ভেঙ্গে যায়। জিবরাইল (আঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে দাওয়াত জানালেন এবং নবীজীকে যমযমের কাছে নিয়ে গেলেন। সিনা মোবারক বিদীর্ণ করে যমযমের পানি দিয়ে ধৌত করে নূর এবং হেকমত দিয়ে পরিপূর্ণ করলেন। এভাবে মহাশূন্যে ভ্রমণের প্রস্তুতিপর্ব শেষ করলেন।

নিকটেই বোরাক দণ্ডায়মান ছিল। বোরাকের আকৃতি ছিল অদ্ভুত ধরনের। গাধার চেয়ে উঁচু, খচ্চরের চেয়ে নিচু, মুখমণ্ডল মানুষের চেহারাসদৃশ, পা উটের পায়ের মত এবং পিঠের কেশর ঘোড়ার মতো (রুহুল বয়ান-সুরা ইসরা)। মূলতঃ বোরাক ছিল বেহেস্তি বাহন- যার গতি ছিল দৃষ্টি সীমান্তে মাত্র এক কদম। নবী করিম (সা.) বোরাকে সওয়ার হওয়ার চেষ্টা করতেই বোরাক নড়াচড়া শুরু করলো। জিব্রাইল (আঃ) বললেন, ‘তোমার পিঠে সৃষ্টির সেরা মহামানব সওয়ার হচ্ছেন- সুতরাং তুমি স্থির হয়ে যাও।’

বোরাক বলল, কাল হাশরের দিনে নবী করিম (সা.) আমার জন্য আল্লাহর দরবারে শাফাআত করবেন বলে ওয়াদা করলে আমি স্থির হবো। নবী করিম (সা.) ওয়াদা করলেন। বোরাক স্থির হলো। তিনি বোরাকে সওয়ার হলেন। জিব্রাইল (আঃ) সামনে লাগাম ধরে, মিকাইল (আঃ) রিকাব ধরে এবং ইস্রাফিল (আঃ) পিছনে পিছনে আগ্রসর হলেন। পিছনে সত্তর হাজার ফেরেস্তার মিছিল।

মক্কা শরীফ থেকে রওনা দিয়ে পথিমধ্যে মদিনার রওযা মোবারকের স্থানে গিয়ে বোরাক থামল। জিবরাইলের ইশারায় সেখানে তিনি দু’রাকাত নামায আদায় করলেন। এভাবে ইসা (আঃ) এর জন্মস্থান বাইতুল লাহাম এবং মাদ্ইয়ান নামক স্থানে শুয়াইব (আঃ) এর গৃহের কাছে বোরাক থেকে নেমে নবী করিম (সা.) দু’রাকাত করে নামায আদায় করলেন। এজন্যই বরকতময় স্থানে নামায আদায় করা সুন্নত। এই শিক্ষাই এখানে রয়েছে। নবী করিম (সা.) এরশাদ করেন, আমি বোরাক থেকে দেখতে পেলাম- হযরত মুসা (আঃ) তাঁর মাযারে (জর্দানে) দাঁড়িয়ে নামায পড়ছেন।

অতঃপর জিবরাইল (আঃ) বায়তুল মোকাদ্দাছ মসজিদের সামনে বোরাক থামালেন। সমস্ত নবীগণ আগে থেকে সেখানে সশরীরে উপস্থিত ছিলেন। জিবরাইল (আঃ) বোরাককে রশি দিয়ে বায়তুল মোকাদ্দাছে ছাখ্রা নামক পবিত্র পাথরের সাথে বাঁধলেন এবং আযান দিলেন। সমস্ত নবীগণ (আঃ) নামাযের জন্য দাঁড়ালেন। হযরত জিবরাইল (আঃ) নবী করিম (সা.) কে মোসল্লাতে দাঁড় করিয়ে ইমামতি করার জন্য অনুরোধ করলেন। হুযুর (সা.) সমস্ত আম্বিয়ায়ে কেরাম ও সত্তর হাজার ফেরেশতাকে নিয়ে দু’রাকাত নামায আদায় করলেন।

তখনো কিন্তু নামায ফরজ হয়নি। প্রশ্ন জাগে- নামাযের আদেশ নাযিল হওয়ার আগে হুযুর (সা.) কিভাবে ইমামতি করলেন? বুঝা গেল- তিনি নামাযের নিয়ম কানুন আগেই জানতেন। নামাযের তা’লীম তিনি আগেই পেয়েছিলেন; তানযীল বা নাযিল হয়েছে পরে। আজকে প্রমাণিত হলো- নবী করিম (সা.) হলেন ইমামুল মোরছালিন ও নবীউল আম্বিয়া (আঃ)। নামায শেষে আয়োজিত সংক্ষিপ্ত সভায় নবীগণ নিজেদের পরিচয় দিয়ে বক্তব্য পেশ করলেন। সর্বশেষ সভাপতি (মীর মজলিস) হিসাবে ভাষণ রাখলেন নবী করিম (সা.)। তাঁর ভাষণে আল্লাহ্ তাআলার প্রশংসা করে তিনি বললেন- ‘আল্লাহ্ পাক আমাকে আদম সন্তানগণের মধ্যে সর্দার, আখেরি নবী ও রাহমাতুল্লিল আলামীন বানিয়ে পাঠিয়েছেন।’

[এখানে একটি আকীদার প্রশ্ন জড়িত আছে। তা হলো- আম্বিয়ায়ে কেরামগণের মধ্যে চারজন ছাড়া আর সকলেই ইতিপূর্বে ইন্তিকাল করেছেন এবং তাঁদের রওযা মোবারকও বিভিন্ন জায়গায় অবস্থিত। যে চারজন নবী জীবিত, তারা হচ্ছেন- হযরত ইদ্রিস (আঃ) বেহেস্তে, হযরত ইসা (আঃ) আকাশে, হযরত খিজির (আঃ) জলভাগের দায়িত্বে এবং হযরত ইলিয়াছ (আঃ) স্থলভাগের দায়িত্বে। জীবিত ও ইন্তিকালপ্রাপ্ত সকল আম্বিয়ায়ে কেরাম (আঃ) বিভিন্ন স্থান থেকে মুহূর্তের মধ্যে কিভাবে সশরীরে বায়তুল মোকাদ্দাছে উপস্থিত হলেন?

তাফসীরে রুহুল বয়ানে এ প্রশ্নের উত্তর এভাবে দেয়া হয়েছে- ‘জীবিত চারজন নবীকে আল্লাহ্ তা’আলা সশরীরে এবং ইন্তিকাল প্রাপ্ত আম্বিয়ায়ে কেরামগনকে মেছালী শরীরে বায়তুল মোকাদ্দাছে উপস্থিত করেছিলেন।’ কিন্তু অন্যান্য গ্রন্থে সশরীরে উপস্থিতির কথা উল্লেখ আছে। কেননা, নবীগণ অষ্ট অঙ্গ দ্বারা সিজদা করেছিলেন। নবীগণ ও ওলীগণ মেছালী শরীর ধারণ করে মুহূর্তের মধ্যে আসমান জমিন ভ্রমণ করতে পারেন এবং জীবিত লোকদের মতই সব কিছু শুনতে ও দেখতে পারেন (মিরকাত ও তাইছির গ্রন্থ)।

কৃতজ্ঞতা : অধ্যক্ষ হাফেজ এম. এ জলিল (রহ.) প্রণীত ‘নূরনবী (সা.)’ গ্রন্থ থেকে শবে মেরাজের বর্ণনা

বিজনেস আওয়ার/১৫ জানুয়ারি,২০১৯/ আরআই

পাঠকের মতামত: