ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬
sristymultimedia.com

প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » বিস্তারিত


ss-steel-businesshour24

Runner-businesshour24

জনতা ব্যাংকের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার

আপডেট : 2019-02-05 12:41:06
জনতা ব্যাংকের নাজুক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বিগ্ন সরকার



বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : রাষ্ট্র মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক ভালো নেই। নানা অনিয়ম আর দুর্নীতির কারণে এই ব্যাংকটির অবস্থা এখন বড়ই নাজুক। টাকা ধার করে ও মূলধন ভেঙে দৈনন্দিন কাজ চালাতে হচ্ছে ব্যাংকটির। আর সেই সঙ্গে বেড়েছে খেলাপি ঋণ। সাথে বড় ধরনের লোকসানেও গুনতে হচ্ছে জনতা ব্যাংকের। আর এই পরিস্থিতিতে রীতিমতো উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১১ হাজার ৪৮৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ব্যাংকটির খেলাপি ঋণ ছিল ৫ হাজার ৮১৮ কোটি টাকা। আর ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ৩০৪ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। দেশের ৫৮টি ব্যাংকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি ঋণ এখন জনতা ব্যাংকে।

ব্যাংক খাতে যে শীর্ষ ১০০ ঋণ খেলাপি রয়েছে, তার এক-চতুর্থাংশই জনতা ব্যাংকের। গত জুন মাসের শেষে জনতা ব্যাংকের খেলাপি ঋণ ছিল নয় হাজার ৮৭৯ কোটি টাকা। ফলে গত ছয় মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সূত্র বলছে, জনতা ব্যাংকের ১৭ হাজার কোটি টাকারও বেশি খেলাপি ঋণের মধ্যে কেবল দু'টি গ্রুপের কাছেই রয়েছে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা। ওই প্রতিষ্ঠান দুটি হলো— ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপ।

ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ কেলেঙ্কারির কারণে এরইমধ্যে ব্যাংকটির পুরনো ঢাকার ইমামগঞ্জ ও মোহাম্মদপুর করপোরেট শাখার বৈদেশিক ব্যবসার লাইসেন্স (এডি লাইসেন্স) বাতিল করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এই দুটি শাখায় এলসি খোলাসহ বৈদেশিক বাণিজ্য কার্যক্রম বন্ধ হওয়ায় সামগ্রিকভাবে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে ব্যাংকটির ওপরে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত এক বছরে ব্যাংকটির লোকসানি শাখা বেড়েছে ৩১টি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষে ব্যাংকটির লোকসানি শাখা ছিল ৫৭টি। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে এসে এসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৮টিতে।

গত ৩১ জানুয়ারি অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের পক্ষ থেকে সরকারি বিভিন্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ‘বার্ষিক কর্ম সম্পাদন চুক্তি’র অগ্রগতি বিষয়ে এক আলোচনা সভায় রাষ্ট্র মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ওই সভায় ব্যাংকটিকে দ্রুত খেলাপি ঋণ আদায়ের যাবতীয় কার্যকর ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র বলছে, নতুন বছরের শুরু থেকেই আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার থেকে ধার বাড়িয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংক। কলমানি থেকে এখন প্রতিদিনই ব্যাংকটিকে ধার করতে হচ্ছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খন্দকার ইব্রাহিম খালেদ বলেন, ভালো ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংক ছিল অন্যতম। অথচ এখন সেই ব্যাংক ধার করে চলছে। ব্যাংকটিতে দীর্ঘদিন সুশাসন না থাকার কারণেই এমনটি হয়েছে।

গত ডিসেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ পরিসংখ্যান বলছে, খেলাপি ঋণ আদায়ে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে জনতা ব্যাংক। খেলাপি ঋণ আদায়ের টার্গেট দেওয়া হয়েছিল ৫০০ কোটি টাকা। কিন্তু ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর’২০১৮) আদায় হয়েছে মাত্র ১৫৮ কোটি টাকা। একইভাবে অবলোপনকৃত ঋণ থেকে আদায় করার টার্গেট ছিল ১৫০ কোটি টাকা। কিন্তু জনতা ব্যাংক আদায় করেছে মাত্র ১৮ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।

এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের কর্মকর্তারা বলেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপ বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা পেয়েছে জনতা ব্যাংক থেকে । অথচ, তারা ঋণের টাকা ফেরত দিচ্ছে না। উপরন্তু, অ্যাননটেক্স গ্রুপ ব্যাংকটি থেকে আরও টাকা চেয়ে আবেদন করেছে। টাকার জন্য প্রতিষ্ঠানটির মালিক ইউনূস বাদল সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সঙ্গে সচিবালয়ে বৈঠকও করেছিলেন।

যদিও অ্যাননটেক্স গ্রুপ বিভিন্ন কোম্পানির নামে বিভিন্ন সময়ে কাঁচামাল আমদানির জন্য ঋণপত্র খুললেও টাকা পরিশোধ করেনি। প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষে ব্যাংক নিজেই বাধ্য হয়ে বিদেশি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে অর্থ পরিশোধ করেছে। এসব দায়ের বিপরীতে ফোর্সড ঋণ তৈরি করেছে জনতা ব্যাংক।

জানা গেছে, ক্রিসেন্ট গ্রুপ বিভিন্ন সরকারি তহবিল ও জনতা ব্যাংক থেকে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বেশি আর্থিক সুবিধা নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি চামড়ার ভুয়া রফতানি বিল তৈরি করে সরকারের কাছ থেকে নগদ রফতানি সুবিধা নিয়েছে। কিন্তু চামড়া রফতানি করলেও তারা দেশে টাকা ফেরত আনেনি। এই প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার হলেন দুই ভাই। একজন এম এ কাদের এবং অন্যজন আবদুল আজিজ। আবদুল আজিজ জাজ মাল্টিমিডিয়ারও কর্ণধার।

এই দুই ভাইয়ের বিরুদ্ধে অনুসন্ধান করে ৯১৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশে পাচারের তথ্য পেয়েছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। এর আগে টাকা আদায়ে এম এ কাদের ও তার ভাই আবদুল আজিজের সম্পদ নিলামে তুলেছে জনতা ব্যাংক।

এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আব্দুছ ছালাম আজাদ বলেন, ক্রিসেন্ট গ্রুপ ও অ্যাননটেক্স গ্রুপের কাছ থেকে টাকা আদায়ে আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে চেষ্টা করে যাচ্ছি। তারা কয়েকদফায় টাকা ফেরত দেওয়ার অঙ্গীকারও করেছে। কিন্তু আমরা তাদের সহযোগিতা পাচ্ছি না।

বিজনেস আওয়ার/০৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮/এমএএস

পাঠকের মতামত: