ঢাকা, শুক্রবার, ২৬ এপ্রিল ২০১৯, ১৩ বৈশাখ ১৪২৬
sristymultimedia.com

প্রচ্ছদ » অর্থনীতি » বিস্তারিত


ss-steel-businesshour24

Runner-businesshour24

ঋণ জালিয়াতি; ফেঁসে যাচ্ছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ

আপডেট : 2019-02-07 09:23:33
ঋণ জালিয়াতি; ফেঁসে যাচ্ছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ

বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে ক্রিসেন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির যে অভিযোগ উঠেছে, এর সত্যতা মিলেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানে। ঋণের নামে জালিয়াতির মাধ্যমে জনতা ব্যাংক থেকে ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা আত্মাসাতের প্রাথমিক প্রমাণ পেয়েছে দুদক।

জানা গেছে, দুদকের অনুসন্ধানে এই ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করা গেছে। এদের মধ্যে গ্রুপটির চেয়ারম্যান এমএ কাদের ও তার স্ত্রীসহ মালিকপক্ষের ৫ জন এবং ব্যাংকের জিএম থেকে নোট প্রস্তুতকারী কর্মকর্তা পর্যন্ত ১৩ জনের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

এই ১৮ জনের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করার প্রমাণ মিলেছে। এসব ব্যক্তিকে আসামি করে শিগগিরই মামলা করতে যাচ্ছে দুদক। এরই মধ্যে তাদের দেশ ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে। দুদকের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

এর আগে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বিদেশে পাচারের অভিযোগে ক্রিসেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদফতর। ওই মামলায় সম্প্রতি কোম্পানির চেয়ারম্যান এমএ কাদের গ্রেফতার হয়ে কারাগারে আছেন।

এ প্রসঙ্গে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় সবচেয়ে বড় সমস্যা হল সুশাসনের অভাব। এর সুযোগ নিচ্ছে একটি গ্রুপ। এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা উচিত। এতে ঋণখেলাপির কাছে একটি বার্তা যাবে।

সূত্র জানায়, দুদকের অনুসন্ধানের যাদের জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে, তারা হলেন- ক্রিসেন্ট ট্যানারিজ, ক্রিসেন্ট লেদার ও রুপালি কম্পোজিট লেদারওয়্যারের চেয়ারম্যান এমএ কাদের, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও তার স্ত্রী মিসেস সুলতানা বেগম, রিমেক্স ফুটওয়্যারের চেয়ারম্যান ও এমএ কাদেরে ভাই আবদুল আজিজ এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আবদুল আজিজের স্ত্রী মিসেস লিটুল জাহান মির এবং ক্রিসেন্ট লেদারের পরিচালক রেজিয়া বেগম।

এছাড়া জনতা ব্যাংকের ১৩ কর্মকর্তাকে দায়ী করা হয়েছে। তারা হলেন- তৎকালীন ব্যাংকের ফরেন ট্রেড ডিভিশনের জেনারেল ম্যানেজার এবং বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) মো. ফখরুল আলম, তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান ঢাকা দক্ষিণ ও বর্তমানে সোনালী ব্যাংকের ডিএমডি মো. জাকির হোসেন, তৎকালীন (ঘটনার সময়) ব্যাংকের ফরেন ট্রেড ডিভিশনের ডিজিএম এবং বর্তমানে প্রধান কার্যালয়ের ডিজিএম কাজী রইস উদ্দিন আহমেদ।

এছাড়াও রয়েছে নোট প্রস্তুতকারী সিনিয়র অফিসার মো. আবদুল্লাহ আলম মামুন, পরীক্ষণকারী সিনিয়র অফিসার মো. সাইদুজ্জামান, সুপারিশকারী প্রিন্সিপ্যাল অফিসার মো. রুহুল আমিন, সিনিয়র প্রিন্সিপ্যাল অফিসার মো. মগরেব আলী, মো. খায়রুল আমিন, এজিএম আতাউর রহমান, অনুমোদনকারী ডিজিএম মো. রেজাউল করিম, মোহাম্মদ ইকবাল এবং একেএম আসাদুজ্জামান।

দুদকের প্রতিবেদন অনুসারে ক্রিসেন্ট গ্রুপের রফতানি বিল কিনে নিয়েছে জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখা। নিয়ম অনুসারে আগাম টাকার প্রয়োজনে কোনো রফতানিকারক পণ্য রফতানির পর এ সংক্রান্ত সব কাগজপত্র জমা দিয়ে ব্যাংকের কাছে টাকা চাইতে পারে।

এক্ষেত্রে ওই ব্যাংক বিল কিনে নিয়ে রফতানিকারককে ৯০ শতাংশ টাকা পরিশোধ করার বিধান রয়েছে। ব্যাংকিংয়ের ভাষায় এই প্রক্রিয়াকে ‘ফরেন ডকুমেন্ট বিল পার্সেস (এফডিবিপি)’ বলে।

তবে এফডিবিপির ক্ষেত্রে অবশ্যই ১২০ দিনের মধ্যে ব্যাংকে টাকা পরিশোধে বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের মাধ্যমে ব্যাংককে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে যে, বিলের টাকা পাওয়া যাবে।

আর এ প্রক্রিয়ার (এফডিবিপি) মাধ্যমেই ক্রিসেন্ট গ্রুপ টাকা নিয়েছে। এক্ষেত্রে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড শিপিং লাইন এবং ইউরো এশিয়া শিপিং লাইনের নামে ভুয়া কাগজপত্র বানিয়ে ব্যাংকে দাখিল করা হয়েছে।

হংকং, থাইল্যান্ড ও দুবাইয়ে নিবন্ধিত সান পল লেদার ক্র্যাফট, বায়ো লি ডা ট্রেডিং কর্পোরেশন, মার্চেন্ট ট্রেড গ্যারান্টি কর্পোরেশন কোম্পানি, ব্রাইট বিউ জেনারেল ট্রেডিং নামে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিল দাখিল করা হয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক ডকুমেন্ট নেয়া হয়েছে আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়ার এক্সিও ক্রেডিট ব্যাংক লিমিটেড নামের প্রতিষ্ঠান থেকে। এই ব্যাংক থেকেই ২২১টি এলসি ইস্যু করা হয়েছে। তবে আদৌ এ সংক্রান্ত কোনো এলসি খোলা হয়েছে কি না সন্দেহ রয়েছে।

সূত্র জানায়, এই ঋণের ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি আইনের তোয়াক্কা করেনি ক্রিসেন্ট গ্রুপ। রফতানি বিল ক্রয়ের ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানে সন্তোষজনক ক্রেডিট রিপোর্ট জরুরি। আর প্রথম লেনদেনের আগে প্রধান কার্যালয়ের অনুমোদন নিতে হয়।

কিন্তু এই নিদের্শনা মানেনি জনতা ব্যাংকের ইমামগঞ্জ শাখা। ফলে নিয়মবহির্ভূতভাবেই ক্রিসেন্টকে একটি বিলের বিপরীতে ৩৪৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকা দেয়া হয়েছে।

দুদকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ক্রিসেন্ট গ্রুপের টাকা পাচারের ক্ষেত্রে ব্যাংকের যেসব দুর্বলতা চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- দেশের বাইরের ব্যাংকের সঙ্গে এলসি খোলার সময় ওই ব্যাংক আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন কি না, তা যাচাই করেনি জনতা ব্যাংক।

আর রফতানির চুক্তিতে কোনো সাক্ষীর স্বাক্ষর নেই, যা আন্তর্জাতিক আইনে গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া এফডিবিপি ক্রয়ের ক্ষেত্রে ওই প্রতিষ্ঠানের স্বাক্ষর যাচাই করা হয়নি। জনতা ব্যাংকের নীতিমালায় কোনো ত্রুটিপূর্ণ বিল ক্রয় না করার নিয়ম থাকলেও এক্ষেত্রে সেটি মানা হয়নি।

বিল ক্রয়ের ক্ষেত্রে আমদানিকারকের একসেপটেন্স (সম্মতি) বাধ্যতামূলক থাকলেও সেটি লঙ্ঘন করা হয়েছে। ব্যাংকের ডকুমেন্টের সঙ্গে রিলেশন ম্যানেজমেন্ট অ্যাপ্লিকেশন না থাকায় সুইফট মেসেজ বিনিময়ের শর্ত লঙ্ঘন করা হয়েছে।

এ মামলায় গ্রুপটির ৫টি প্রতিষ্ঠান জড়িত। এর মধ্যে রয়েছে ক্রিসেন্ট লেদার, ক্রিসেন্ট ট্যানারি, লেসকো লিমিটেড, রূপালী কম্পোজিট লেদারওয়্যার এবং রিমেক্স ফুটওয়্যার।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অসৎ উদ্দেশ্যে বিশ্বাসভঙ্গ করে ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে জাল-জালিয়াতির আশ্রয়ে রফতানি না করেও ভুয়া ডকুমেন্ট দিয়েছে ক্রিসেন্ট গ্রুপ। এই প্রক্রিয়ায় গ্রুপের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা দিয়েছে জনতা ব্যাংক। ফলে এটি আত্মসাৎ বলে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত।

এ কারণে আসামিদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধি-১৮৬০ এর ৪০৯/১০৯/১২০/৪৬৭/৪৭১ এবং ১৯৪৭ সনের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় পাঁচটি মামলার অনুমোদন চাওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এ প্রসঙ্গে, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইনটেলিজেন্স ইউনিটের প্রধান আবু হেনা মোহাম্মদ রাজী হাসান বলেন, বিষয়টি আইনি ব্যাপার। বাংলাদেশ ব্যাংক এ ব্যাপারে তদন্ত করতে পারলেও মামলা করার আইনি ক্ষমতা নেই। দুদকসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান যার যার আইন অনুসারে মামলা করবে, এটাই স্বাভাবিক।

বিজনেস আওয়ার/০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮/এমএএস

পাঠকের মতামত: