ঢাকা, সোমবার, ১৯ আগস্ট ২০১৯, ৩ ভাদ্র ১৪২৬
sristymultimedia.com

প্রচ্ছদ » মতামত » বিস্তারিত


ss-steel-businesshour24

Runner-businesshour24

এক দেশ একাধিক নীতি

আপডেট : 2019-04-10 20:50:29
এক দেশ একাধিক নীতি

আব্দুল্লাহ আল মামুন : একটি দেশকে কেন্দ্র করে একধিক নীতির কথা বলতে গেলে প্রথমেই আসে চীন ও হংকং এর কথা। আমরা সাধারণ জ্ঞান পড়তে গেলে কিংবা বহির্বিশ্বের রাজনীতির দিকে তাকালে দেখি চীনে ১৯৯৭ সাল থেকে এক দেশে দুই নীতি করা হয়েছে, সেটা তাদের বৃহৎ স্বার্থের জন্য। হংকংকে যাতে গনচীনের মত বিভিন্ন কাঠামোতে না রেখে শুধুমাত্র বানিজ্যিক ভাবে ব্যবহার করা যায় সে জন্য দুই নীতি গ্রহণ করা হয়। যেখানে গনচিনের মাথা পিছু আয় ১৬৭৬০ ডলার (পিপিপি) আর হংকং এর আয় ৬৪১০০ ডলার(পিপিপি) সূত্র - বিশ্বব্যাংক ২০১৭। হংকং বিশ্বের অনেক নামি দামি, ঐতিহাসিক শহরকে পিছনে ফেলে বহির্বিশ্বের শীর্ষ বানিজ্যিক শহর হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

এবার আসি দেশের কথায়। আমাদের দেশেও একাধিক নীতি আছে কিন্তু খালি চোখে তা আমরা দেখতে পারিনা। আমাদের স্কুল কলেজেও তা কখনোই পড়ানো হয়নি এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হয়েও কখনই কোন শিক্ষক আমাদের তা শিক্ষা দেইনি। কেন দেইনি তা এখন অনুধাবন করতে পারি, না দেওয়ার প্রথম কারণ হতে পারে কারিকুলামে ছিল না এগুলো আরো হতে পারে বিশ্লেষণ ধর্মী লেখা পড়া করাতে ওনারা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না। ঐতিহ্যবাহী এবং গতানুগতিক পড়াশোনা করানোর কারনেই ওনারা ওস্তাদ এবং শিক্ষাগুরু। তবে এই দালান কিংবা কাঠামো তৈরী নীতি গুলো ওনাদের চেয়ে বেশি জানেন হতে পারে মূর্খ অথবা অনেক শিক্ষিত যারা ঢাকা শহরে একটি ইমারত বানাতে চেয়েছেন। আমাদের দেশে একাধিক নীতি যেমন আছে, তেমন একাধিক প্রতিষ্ঠানও আছে কারণ এই নীতিগুলো রক্ষা করতে না পারলে আমরা, আমাদের ঐতিহ্য হারাবো, হারাবো সম্মান আর অনেক পুরনো আমাদের নামের সাথে লেগে থাকা মর্যাদা । যেমন ঢাকা শহরে কোথাও একটা ইমারত করবেন, তার জন্য আপনি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি শ্রেণীভুক্ত হয়ে যাবেন যেখানে মোট শ্রেণীই আছে দুইটা শুধু তাই নয় আপনাকে অনেক রীতি-নীতির সাথে পরিচয় এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।

আপনি যদি প্রথম শ্রেণীর কেউ হতে চান তাহলে আপনার কোন আত্মীয়-স্বজন কিংবা কাছের বন্ধু-বান্ধব ওই সমস্ত নীতির নির্ধারক হতে হবে কিংবা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অথবা আপনি নিজেই যদি এমন কোন ক্ষমতাবান ব্যাক্তি হন তবে আপনার আর কোন সমস্যা নাই এবং আপনি প্রথম শ্রেণীর সমস্ত মানদণ্ড পুরন করতে সক্ষম হয়েছেন। এক্ষেত্রে আপনিও দৈব বাণীর মত কুন বলবেন আর সব কিছু আপনার সামনে হাজির হয়ে যাবে।আপনি যদি ওই সমস্ত গুনধারী বা পটভূমির কেউ না হন তাহলে আপনি দ্বিতীয় শ্রেণীতে অবস্থান করছেন, এক্ষেত্রে আপনি এ সব বাদ দিয়ে পরকালে কিভাবে সোনা-রূপার ইমারত করা যাই তাতেই মনযোগ দিন। কারণ খুবই সহজ, রাজউক, পূর্তবিভাগ, ফায়ার সার্ভিস আর সিটি কর্পোরেশনের ধাঁধায় আপনি নিজেকে খুঁজে নাও পেতে পারেন। আপনি একজনের কাছে যাবেন সে অন্যজনকে দেখিয়ে দিবেন। দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে নিয়ম আবার দুই রকম। একটির কাছে সাত তলা থেকে উচ্চ দালান আর অন্যটির কাছে দশ তলা। একজন আপনাকে বিচার করবে একভাবে অন্য জন অন্য ভাবে যদিও আপনার অবস্থান একই। সমস্যা এখানেই শেষ না, এর পর আরো বড় সমস্যা আছে আর সেটি হল স্থানীয় রাজনীতিবিদগণ। কারণ আপনার জান-মালের নিরাপত্তা নিয়ে দেশীয় সরকার থেকেও তারা বেশী উদ্বিগ্ন। এ ভাবে একটির পর একটি ধাপ পার করে আপনি আপনার সেই কাঙ্খিত দালানের দেখা পাবেন।

একটার পর একটা অগ্নিকান্ড হবে কিছুদিন সবাই মিলে ভুক্তভোগীদের প্রতি শ্রদ্ধা, শোক, রুহের মাগফিরাত এবং গভীরভাবে তদন্ত করার অঙ্গীকার আর তাদের স্বজনদের প্রতি সহমর্মিতা জ্ঞাপন করবেন। একটি দুর্ঘটনার জন্য আমরা বেশিদিন শোকও করতে পারিনা কারণ আর একটি দুর্ঘটনা তখন আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে। আপনি যদি প্রথম শ্রেণীভুক্ত হন তাহলে এতে কোন ঝুঁকি বা ঝামেলার মধ্যে আপনি পড়বেননা, পড়বে যারা আপনাকে অনেক দিন ধরে আপনার ইমারতে থেকে আপনাকে ফাঁকি দিয়ে আসছে, আপনার গড়ে তোলা প্রত্যেকটা ইট-বালি-সিমেন্ট এমনকি টাইলস এবং আরো সরাঞ্জোমকে নিয়মিতভাবে ব্যবহার করছে। তাদের এই ফাঁকির শাস্তি স্বরুপ তারা হয় আগুনে পুড়ে মরবে অথবা আপনার উচ্চ দালান থেকে লাফিয়ে।

আপনাকে ফাঁকি না দিলে তাদের এই রকম পরিনতি হত না যেমনটি হয়েছিল ২০১০ সালে নিমতলিতে, কিছুদিন আগে চুড়িহাট্টাই কিংবা মিরপুরের বস্তিতে আর এখন বাদ যায়নি যারা তুলনামূলক একটু বেশী নিরাপদ জীবনের আশায় ঢাকা শহরের সবচেয়ে নামি-দামি জায়গা গুলশান-বনানী বেছে নিয়েছে। এরা সবাই অপরাধী কারণ তারা অপরাধী না হলে নিজেরাও মরত না আর আপনাকেও জালিয়ে পুড়িয়ে ফাসিয়ে যেত না। এমতাবস্থায় বিশ্বকবির "স্ত্রীর পত্রের" কথা মনে পড়ছে। যেখানে বিন্দুর মৃত্যুতে দেশসুদ্ধ লোক চটে উঠল। বলতে লাগল, “মেয়েদের কাপড়ে আগুন লাগিয়ে মরা একটা ফ্যাশান হয়েছে।” আমার ভয় হয় আমাদের দেশেরেও দালানে পুড়ে মরাটা আবার ফ্যাশানে পরিনত হবে নাতো

যাইহোক আগের কথায় আসি। এই উচ্চ দালানগুলোয় অগ্নুৎপাত আমাদের মাঝে যেভাবে মোটা আকারের দাগ কাটে, সড়ক দুর্ঘটনা সেভাবে কাটতে পারে না, দুটো-একটা ছাড়া। এমনই কিছু সড়ক দুর্ঘটনা আমাদের মাঝে দাগ ফেলে গেছিল সেগুলোও কালের বিবর্তনে অনেকটাই হারিয়ে গেছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিরসরাইয়ের বাস খাদে পড়া, ঘিওরে স্বাধীন বাংলাদেশের দুই কিংবদন্তি তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর, বিমানবন্দর সড়কে দুই স্কুল ছাত্র-ছাত্রি এবং কিছুদিন আগে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আবরার। গত মার্চের এগারো তারিখে লন্ডনে দমকা হাওয়ার কারনে একটি বহুতল ভবন থেকে ইট-সিমেন্ট ধসে পড়ে যদিও কেউই হতাহত হয়নি, অল্পের জন্য একজন বেচে গেছেন, বিষয়টা সম্পর্কে পুরো ইংল্যান্ড বাসী আতংকিত হয়ে পড়েছিল। গত ৩০ মার্চ শিকাগোর মিলওয়াকিতে একটি দালান আগুন লাগলে কেউ হতাহত হয়নি, শুধুমাত্র ৩ জন সাময়িকভাবে একটু অসুস্থ হয়ে যান, যার মধ্যে একজন আবার ফায়ার সার্ভিসের কর্মী। এমনটা হওয়া সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র একটিই কারণ বলা যেতে পারে আর তা হল একটি দালান করতে হলে তার যত নিয়ম কানুন আছে সব মেনে নিয়েই করতে হয়। অথচ আমাদের দেশে কেউ কোন কিছুর ধার ধারেন না। বড় বড় দালান গুলোতে ফায়ার এক্সিট এর দরজায় তালা ঝুলানো থাকে, কিংবা এমন ভাবে দরজা গুলো করা হয় যেন ইমারজেন্সী এক্সিট এর পথ খুঁজে পাওয়ার আগে আপনি উদ্ধার কর্মীদের সহযোগিতায় নেমে আসতে পারবেন। এই যেমন বনানীর এফ-আর টাওয়ার। একটি উচ্চ দালানে ইমারজেন্সী সিড়ি থাকার কথা সেই দালানের প্রশস্থতার উপর নির্ভর করে, কিন্তু যারা এই সমস্ত দালান বানান, মালিক বা প্রকৌশলী তাদের হয়ত বিশ্বাসের মাত্রাটা অনেক বেশী থাকে যে, অন্তত আমার এই দালানে কখনও আগুন কেন দমকা বাতাসও লাগবে না। আবার ইমারজেন্সী সিড়িগুলোর প্রশস্ততা যতটুকু প্রয়োজন সেভাবে করা হয়না। অন্য আর একটি বড় সমস্যা একটি দালান বানাতে গেলে প্রত্যেকটা ফ্লোরের মাঝে একটি ভার্টিকাল সেপারেশন লাগে, যার উচ্চতা অবশ্যই ১ মিটার বা ৩.২৮ ফুট হতে হবে, কিন্তু এই এফ-আর টাওয়ারে ছিল মাত্র ২ ফূটের মত। যদিও রাজউকের এই সমস্ত সমস্যাগুলো তদারকি করা তাদের কাজ তারা সম্ভবত শুধু শহর না, দেশকে কিভাবে উন্নত করা যায় সেই চিন্তায় বেশী মশগুল থাকেন।

আমাদের দেশে আর একটা প্রবনতা আছে যে আমরা অধিকাংশ বিষয়ে বুয়েটের দিকে তাকিয়ে দেখি এবং উদাহরণ টানি, তাদের মেধা, আচরণের প্রশংসা করি আর তাদের সৃষ্টি গুলোর দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি। কিন্তু তারাও যখন আমাদের হতাশ করে, আমরা তখন অবাক হয়, আন্দোলিত হয়। কয়েকদিন আগে স্বয়ং বুয়েটের যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোঃ মাকসুদ হেলালী তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন ওনাদের বিভাগীয় বিল্ডিংটিও ত্রুটিপূর্ণ। আমরা বাঙালি জাতি বিশ্বের বুকে স্বাধীন হিসেবে নিজেদের মাথা উঁচু করে রেখেছি কারণ আমরা মৃত্যুকে ভয় পায়নি। ভারী আগ্নেয় অস্ত্রের সামনে খালি হাতে কিংবা খুব হাল্কা অস্ত্র নিয়েও আমাদের সূর্য সন্তানেরা নিশ্চিত মৃত্যু মনে করেও যুদ্ধ করেছে। তারা মৃত্যুকে যেমন ভয় পায়নি বা পিছিয়েও যায়নি আমরা ঠিক তেমনই মৃত্যুকে ভয় পাই। তাদের মৃত্যু ছিলো দেশকে স্বাধীন করার, দেশের মানুষদেরকে রক্ষা করার, আর আমরা যে মৃত্যুকে ভয় পায় তা হলো কিছু স্বার্থান্নেশী মানুষের কলঙ্কের পরিনামের। আমরা জানি আমাদের শেষ মৃত্যুতে, কিন্তু এদের শেষ কোথায়?

লেখকঃ
আব্দুল্লাহ আল মামুন
শিক্ষার্থী ইংরেজি বিভাগ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বিজনেস আওয়ার ২৪/ ১০ এপ্রিল, ২০১৯/ আরএইচ

পাঠকের মতামত: