ঢাকা, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৫ আশ্বিন ১৪২৬
sristymultimedia.com

প্রচ্ছদ » শেয়ারবাজার » বিস্তারিত


ss-steel-businesshour24

Runner-businesshour24

বিটিআরসি ও গ্রামীণফোন দ্বন্ধ

সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা আদায় প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীরা হারাল ১৪ হাজার কোটি

আপডেট : 2019-09-01 10:55:25
সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা আদায় প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীরা হারাল ১৪ হাজার কোটি

রেজোয়ান আহমেদ : টেলিযোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) গ্রামীণফোনের কাছে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা পাওনা দাবি করছে। কিন্তু শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রামীণফোন তা অস্বীকার করছে। এ নিয়ে বিটিআরসি কয়েক ধাপে গ্রামীণফোনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলেও টাকা আদায় করা সম্ভব হয়নি। ফলে কঠোর অবস্থানে যাওয়ার কথা ভাবছে সরকার। আর উভয় পক্ষের এই দ্বন্ধে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটির বিনিয়োগকারীরা এরইমধ্যে ১৪ হাজার কোটি টাকা হারিয়েছেন।

বিটিআরসি গত ২ এপ্রিল গ্রামীণফোনের কাছে ১২ হাজার ৫৭৯ কোটি ৯৫ লাখ টাকা পাওনা দাবি করে চিঠি দেয়। এরমধ্যে বিটিআরসির পাওনা ৮ হাজার ৪৯৪ কোটি ১ লাখ টাকা ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পাওনা ৪ হাজার ৮৫ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। বিটিআরসির পাওনার মধ্যে ২০১৭ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সুদের পরিমাণ রয়েছে ৬ হাজার ১৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এইসব পাওনা প্রদানে গ্রামীণফোনকে প্রথমবারের চিঠিতে ১০ কার্যদিবস সময় বেধে দেয় বিটিআরসি।

রিপ্লেসমেন্ট সিমের জন্য ট্যাক্স, টু’জি লাইসেন্স নবায়ন ফি ও ইন্টারেস্টবাবদ এই টাকা দাবি করছে বিটিআরসি। যা মূল্যায়ন করেছে কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল।

গ্রামীণফোনের কাছ থেকে সাড়ে ১২ হাজার কোটি টাকা আদায়ে বিটিআরসি পদক্ষেপ গ্রহণ করে গত ২ এপ্রিল। তবে এখনো সেই টাকা আদায় করতে না পেরে গ্রামীণফোনের লাইসেন্স বাতিলের মত চূড়ান্ত পদক্ষেপের দিকে যাচ্ছে সরকার। এরইমধ্যে লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না- তা জানতে চেয়ে ইতোমধ্যে নোটিস পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বিটিআরসিকে। এছাড়া গ্রামীণফোনের বর্তমানে এখন এনওসি (সেবার অনুমোদন ও অনাপত্তিপত্র) দেওয়া বন্ধ রয়েছে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন বিজনেস আওয়ারকে বলেন, শেয়ারবাজারে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি আতঙ্কের খবর হচ্ছে গ্রামীণফোনের কাছে বিটিআরসির টাকা পাওনা দাবি করা। এতোদিন পরে এসে পাওনা দাবির মাধ্যমে বিটিআরসি অদক্ষতার ও অযোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছে। এর আগে তারা কি করেছে? তাদের ভাবা উচিত ছিল গ্রামীণফোন একটি শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত কোম্পানি। তাদের এই আকস্মিক ও বিলম্বিত পাওনা দাবির ফলে শেয়ারটির পতন হচ্ছে। যা ওই কোম্পানির বিনিয়োগকারীসহ সার্বিক শেয়ারবাজারকে ক্ষতির কবলে ফেলেছে।

টাকা আদায়ের এই দ্বন্ধের কারনে গ্রামীণফোনের শেয়ার দর কমে গেছে ১৪ হাজার ১৭৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ কোম্পানিটিতে গত ৫ মাসে বিনিয়োগকারীদের এই বিনিয়োগ মূল্য কমেছে। আর সরকারের কঠোর অবস্থানে যাওয়ার ঘোষণার আলোকে শেয়ারটির দর কোথায় গিয়ে ঠেকে, তা এখনো দেখার বাকি।

শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত গ্রামীণফোনের গত ১ এপ্রিল প্রতিটি শেয়ারের দর ছিল ৪১৭ টাকা। আর ২ এপ্রিল থেকে বিটিআরসির সঙ্গে পাওনা নিয়ে দ্বন্ধ শুরু হওয়ার প্রায় ৫ মাসের মাথায় বা ৩১ আগস্ট শেয়ারটির দর দাড়িঁয়েছে ৩১২ টাকায়। এক্ষেত্রে প্রতিটি শেয়ারের দাম কমেছে ১০৫ টাকা। আর প্রতিষ্ঠানটির মোট ১৩৫ কোটি ৩ লাখ শেয়ারের দাম কমেছে ১৪ হাজার ১৭৮ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

বিটিআরসি ও গ্রামীণফোনের দ্বন্ধে কোম্পানিটির শেয়ার দর কমতে কমতে ৪২ হাজার ১২৯ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। তবে বিটিআরসি ও গ্রামীণফোনের দ্বন্ধ যতদিন চলবে, ততই এই শেয়ার দর কমতে থাকবে বলে আশঙ্কা করছেন বাজার সংশ্লিষ্টরা। একইসঙ্গে কমবে বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগ দর। আর কোম্পানিটির প্রতিটি শেয়ার দর ১ টাকা কমা মানেই বিনিয়োগকারীরা হারাবে ১৩৫ কোটি টাকা।

গত ৫ মাসে গ্রামীণফোনের দর পতনের চিত্র-

এদিকে শীর্ষ মূলধনী কোম্পানি হিসাবে গ্রামীণফোনের শেয়ারের দর পতন সামগ্রিক শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এছাড়া মৌলভিত্তি সম্পন্ন কোম্পানি হিসাবে গ্রামীণফোনের পতন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করছে। আর শেয়ারবাজারের মন্দাবস্থায় সেই পতন ভূমিকা রাখছে বিষ ফোঁড়ার ন্যায়। এক অনুষ্ঠানে শেয়ারবাজারের চলমান মন্দাস্থার জন্য অন্যান্য ইস্যুর সঙ্গে গ্রামীণফোনের সঙ্গে বিটিআরসির দ্বন্ধকেও দায়ী করেন শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) কমিশনার অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন নিজামী।

শেয়ারবাজারের মন্দাবস্থার কারনে নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ বিভিন্ন পক্ষকে দায়ী করা হচ্ছে জানিয়ে মিনহাজ ইমন বলেন, প্রকৃতপক্ষে এবার বাজারের পতনে অন্যতম দায়ী প্রতিষ্ঠান বিটিআরসি। তাদের খামখেয়ালিপনার কারনে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। যাতে কোম্পানিটির হাজার হাজার বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এছাড়া এই কোম্পানিটিতে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সবচেয়ে বেশি আস্থা থাকলেও বিটিআরসির এমন কর্মকান্ডে তা ফাঁটল ধরেছে। এমতাবস্থায় বিনিয়োগকারীসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের উচিত বিটিআরসির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।

এ বিষয়ে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের স্কুল অব বিজনেস অ্যান্ড ইকোনমিকসের ডিন ড. মোহাম্মদ মুসা বিজনেস আওয়ারকে বলেন, বিটিআরসির পাওনা দাবি নিয়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা গেছে বিনিয়োগকারীদের। এটা নিয়ে সরকারের কোন চিন্তা নাই। তবে একটা কোম্পানি বেআইনী কিছু করলে শুধুমাত্র বিনিয়োগকারীদের কথা ভেবে ছাড় দেওয়াটাও ঠিক হবে না। আর যদি গ্রামীণফোন বেআইনী কাজ না করে থাকে, তাহলে কোর্টে ফাইট করুক। তবে বিষয়টি সমাধান হওয়া উচিত। তখন আবার শেয়ার দাম বেড়ে যাবে।

বিটিআরসির পাওনার দাবিকে অস্বীকার করে গত ১৬ এপ্রিল চিঠি দিয়ে জানায় গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ। এতে তাদের দাবিকে প্রত্যাহার করে নিতে বলে। একইসঙ্গে সুন্দর সমাধানের জন্য আলোচনায় বসার আহবান করে। এরপরে বিটিআরসি ১২ মে গ্রামীণফোনকে চিঠি দিয়ে অবিলম্বে পুরো টাকা পরিশোধের জন্য নির্দেশ দেয়। এরপরে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে পুরো টাকা পরিশোধের জন্য ২০ জুন আবারও চিঠি দেয়। তারপর ২৩ জুন বিষয়টি সমাধানের জন্য বিটিআরসিকে আইনগত উপায়ে সালিসি নোটিশ দেয় গ্রামীণফোন। এছাড়া ৩০ জুন বিষয়টি সালিসির মাধ্যমে সমাধানের জন্য টেলিকম সচিবকে চিঠি দেয়। কিন্তু বিটিআরসি সালিসি ব্যবস্থাকে একপাশে রেখে গত ৪ জুলাই গ্রামীণফোনের ব্যান্ডউইথ ৩০ শতাংশ কমানোর জন্য ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারকানেকশন গেটওয়ে (আইআইজি) অপারেটরদের নির্দেশ দেয়।

ব্যান্ডউইথ কমানোর পরিপেক্ষিতে ৬ জুলাই বিটিআরসিকে বিষয়টি প্রত্যাহার করে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করে চিঠি দেয় গ্রামীণফোন। একইসঙ্গে সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনায় বসার আহবান করে। তবে গ্রাহকের সমস্যার কথা চিন্তা করে ১৩ দিনের মাথায় ব্যান্ডউইথ কমানোর নির্দেশান প্রত্যাহার করে নেয় বিটিআরসি।

বিজনেস আওয়ার/০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯/আরএ

পাঠকের মতামত: