বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগে কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের। তাঁরা হিসাব কষছেন, গ্যাসের দাম বাড়ালে কারখানার উৎপাদন খরচ কতটা বাড়বে। আর অন্যদিকে সাধারণ মানুষ হিসাব কষছে, দুই চুলার বিল বাবদ তাদের খরচ কতটা বাড়বে?

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকে। ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ব্যয় ওঠাবেন। সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে গ্যাসের বাড়তি দাম ওঠাবে।

পরিবহন ব্যবসায়ীরা বাড়াবেন ভাড়া। এমনকি ভোজ্যতেল-চিনির দামেও পড়তে পারে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রভাব। সব মিলিয়ে বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়, যা উসকে দেবে মূল্যস্ফীতিকে।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি) গত ডিসেম্বরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় বিতরণকারী কোম্পানিগুলো। গতকাল বুধবারও দুটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হয়েছে।

তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিপ্রেক্ষিতে দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি অনুমিতই ছিল। গত বছরের এপ্রিল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়, যার দাম পড়ছে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৩০ টাকা।

এ দর দেশীয় গ্যাসের চার গুণের বেশি। এলএনজির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার।

গণশুনানি করে বিইআরসি গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়িয়েছিল। অবশ্য ভোটের আগে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় গ্যাসের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপায়নি। সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সেটি সমন্বয় করা হয়।

বিতরণকারীরা মূল্যবৃদ্ধির যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। এবারের প্রস্তাবে সব ধরনের গ্যাসের দাম গড়ে ১০৩ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।

এ ব্যাপারে ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, গ্যাসের দাম বাড়ালে পরিবহন, বিদ্যুৎ, পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে সব খাতে ব্যয় বাড়বে।

এই বাড়তি ব্যয়ের প্রতিটি অর্থ আবার ব্যবসায়ীরা জনগণের কাছ থেকেই পণ্য ও সেবার দাম বাড়িয়ে আদায় করবেন। ফলে শেষ পর্যন্ত গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির মূল্য সাধারণ মানুষকেই দিতে হবে।

শিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বে রপ্তানি খাত। যেসব পণ্যের একটি বড় অংশ দেশে আমদানি হয়, তাদের বিপদটাও কম নয়। রপ্তানি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দেশে উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজার পেয়ে যেতে পারে আমদানি পণ্য।

বিদেশি সুতার সঙ্গে তেমনই এক লড়াই দেশের বস্ত্রকল বা টেক্সটাইল মিলগুলোর। বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি মোহাম্মদ আলী মনে করেন, প্রস্তাবিত হারে গ্যাসের দাম বাড়ালে একটি বস্ত্রকলও টিকে থাকতে পারবে না।

তিনি বলেন, বর্তমানে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে গ্যাসের মূল্য বাবদ ১১ টাকা ৭৬ পয়সা খরচ হয়। প্রস্তাব অনুযায়ী গ্যাসের দাম বাড়লে এ ব্যয় বেড়ে ২৩ টাকা ৮০ পয়সা কাছাকাছি দাঁড়াবে। বর্তমানে সুতা উৎপাদনের যে খরচ, সেটাই উঠছে না। বিদেশি সুতার সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা যাচ্ছে না।

ইস্পাত খাতের উৎপাদনে গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার অনেক বেশি। এক টন রড উৎপাদনে জ্বালানির পেছনে ব্যয় হয় প্রায় সাত হাজার টাকা। গ্যাসের দাম বাড়লে রড উৎপাদনে ব্যয় আরও সাত হাজার টাকার মতোই বাড়তে পারে। এখন প্রতি টন ভালো মানের রড বিক্রি হয় ৬৫-৬৭ হাজার টাকায়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ অটো রি-রোলিং অ্যান্ড স্টিল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি শেখ মাসাদুল আলম বলেন, আগামী দিনগুলোতে ক্রেতার ওপর বাড়তি চাপ আসতে পারে। কারণ, গ্যাসের দাম বাড়বে, ডলারের দাম বাড়ছে। নতুন মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) আইন কার্যকর হলে করের চাপও বাড়বে।

দেশে এখন দৈনিক মোট গ্যাস সরবরাহ প্রায় ৩২০ কোটি ঘনফুট, যার ৪০ শতাংশই বিদ্যুৎ খাতে ব্যবহৃত হয়। গ্যাসের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর দাবি তুলবে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

শেষ পর্যন্ত বিদ্যুতের দামের চাপ সাধারণ মানুষের ঘাড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। পাশাপাশি বিদ্যুতের দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়বে দেশের শিল্প খাতেও।

বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন ভোজ্যতেল ও চিনির কাঙ্ক্ষিত মূল্য হিসাব করতে একটি ব্যয় বিবরণী অনুসরণ করে। সেখানে দেখা যায়, প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বাবদ ব্যয় ৫০ পয়সা। তেলের ক্ষেত্রে তা ৬০ পয়সা। গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সেটার প্রভাব তেল-চিনির ওপর পড়বে।

সিটি গ্রুপের পরিচালক বিশ্বজিৎ সাহা বলেন, আমরা তেল, চিনি, আটা, ময়দা, সুজি, পোলট্রি খাদ্য ইত্যাদি পণ্য উৎপাদন করি। সব ক্ষেত্রেই প্রচুর গ্যাস-বিদ্যুৎ লাগে। দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই এসব পণ্যের উৎপাদন খরচের ওপরও একটা প্রভাব পড়বে।

বিজনেস আওয়ার/১৪ মার্চ, ২০১৯/এমএএস