বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকদের তথ্য সংরক্ষণের গোপনীয়তার বিধান শিথিল করা হচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে গ্রাহকের সব ধরনের তথ্য চাইতে পারবে সরকারি খাতের পাঁচটি সংস্থা।

এ আইনের খসড়া অনুসারে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের গোপনীয় তথ্য পাঁচটি সংস্থাকে দিতে বাধ্য থাকবে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের গোপনীয় তথ্য নিয়ে অনুসন্ধান বা তদন্ত করতে পারবে সংস্থাগুলো।

এ সংস্থাগুলো হল- আদালত বা ট্রাইব্যুনাল, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ), দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

এছাড়া পেশাগত কারণে আরও কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি ও পেশাজীবী প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের প্রয়োজনীয় তথ্য নিতে পারবে সংস্থাগুলো। তবে সব ধরনের তথ্য পাবে না সংস্থাগুলো।

আগে শুধু আদালত ও বাংলাদেশ ব্যাংক গোপনীয় তথ্য চাইতে পারত। প্রয়োজনবোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য সংগ্রহ করা হতো। এর বাইরে সীমিত আকারে এনবিআর কিছু তথ্য চাইতে পারত।

এমন বিধান রেখে ‘ব্যাংকার বহি সাক্ষ্য আইনের’ খসড়া প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ আইনটিতে সংযোজন ও বিয়োজনও করেছে।

মতামত নিতে বিভিন্ন ব্যবহারকারীর কাছে আইনের খসড়াটি পাঠানোর পর ইতিমধ্যে মতামত পাওয়া গেছে। এর আলোকে খসড়াটি চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে এর আরও কিছু দিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংক এখন পর্যালোচনা করছে।

তাদের কাজ শেষ হলেই আইন মন্ত্রণালয়ে এটি পাঠানো হবে। আইন মন্ত্রণালয়ের ইতিবাচক মতামত পাওয়া গেলে মন্ত্রিসভায় এটি উপস্থাপন করা হবে। এরপর যাবে সংসদে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের হিসাবের তথ্য অবশ্যই গোপনীয়। এ গোপনীয়তা রক্ষা করা হয় বলেই ইউরোপীয় দেশগুলোতে আমানতকারীরা অর্থ রাখার জন্য নিরাপদ বোধ করেন।

বর্তমানে পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে অনেক তথ্য প্রকাশ করতে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নজর রাখতে হবে যাতে আইনের বাইরে গিয়ে কোনো গ্রাহকের তথ্য প্রকাশ করা না হয়। সেটি করলে আর্থিক ব্যবস্থার প্রতি গ্রাহকদের আস্থা নষ্ট হবে। এতে দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, গ্রাহকদের তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য ১৮৯১ সালে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছিল। পরে বিভিন্ন সময় সীমিত আকারে আইনটি সংশোধন করা হয়েছে। তবে আইনটি দিয়ে এখন বহুমুখী ইস্যুগুলো মোকাবেলা করা সম্ভব হচ্ছে না।

যেমন- আগে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ছিল না, আর্থিক প্রতিষ্ঠানও ছিল না, ক্রেডিট ইনফরমেশন ব্যুরো (সিআইবি) ছিল না। এছাড়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তাজনিত এখনকার মতো বিষয়গুলোও আগে ছিল না। এসব বিবেচনায় সময়োপযোগী করতে আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, আইনটি দ্রুত সংশোধন করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, দুর্নীতি দমন আইনসহ অনেক আইনের সঙ্গে ব্যাংকার বহি সাক্ষ্য আইনের কিছু ধারা সাংঘর্ষিক।

এ কারণে আইনটি সংশোধন করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গ্রাহকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়েও বিশেষ নজর রাখা হয়েছে। আইনের খসড়া অনুযায়ী সংঘটিত অপরাধের তদন্ত বা বিচারের উদ্দেশ্যে গ্রাহকের তথ্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে দেয়া যাবে।

এসব ক্ষেত্রে তথ্য পেতে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) পরিচালক বা সমমর্যাদার কোনো ব্যক্তির লিখিত অনুমোদন থাকলে তথ্য দেয়া যাবে। এছাড়া সংস্থার প্রধান বা জাতীয় বেতন স্কেলের পঞ্চম গ্রেডের নিচে নয় এমন কর্মকর্তার লিখিত অনুরোধ থাকলে তথ্য দেয়া যাবে।

মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন অনুসারে যে কোনো অনুসন্ধান বা তদন্তের জন্য কোনো উপযুক্ত আদালত বা বিশেষ ট্রাইবুন্যালের আদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা গ্রাহকের তথ্য চাইতে পারবে। যে কোনো প্রয়োজনে বাংলাদেশ আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিটও ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গ্রাহকের তথ্য চাইতে পারবে।

সূত্র জানায়, জঙ্গি অর্থায়ন, মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ কার্যক্রমে গ্রাহকের হিসাবের তথ্য জানা বিভিন্ন সংস্থার কাছে খুব প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। এসব বিবেচনায় সংশোধিত আইনে গ্রাহকের তথ্য দেয়ার বিধান শিথিল করা হয়েছে।

নতুন আইনে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের গ্রাহকের তথ্য পাওয়া ও ব্যবহারের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। এ আইন ভঙ্গ করে তথ্য দিলে সেক্ষেত্রে শাস্তির বিধানও কয়েকগুণ বাড়ানো হয়েছে।

আইন অনুযায়ী বিধিবহির্ভূতভাবে কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা গ্রাহকের তথ্য প্রকাশ করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা বা তিন বছরের জেল বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করা যাবে।

অন্য ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড দেয়া যাবে। কোনো কর্মকর্তা অবসর গ্রহণ করলেও তার দায়িত্ব পালনকালে বেআইনিভাবে গ্রাহকের তথ্য প্রকাশিত হলে এর দায়ও তাকে বহন করতে হবে।

সূত্র জানায়, বিশ্বব্যাপী আমানতকারীদের জমা অর্থের গোপনীয়তা কঠোরভাবে রক্ষা করা হয়। এক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ড সবচেয়ে এগিয়ে। এ কারণে দেশটির ব্যাংকগুলো আমানতকারীদের পছন্দের শীর্ষে। আন্তর্জাতিক আইনের কারণে সুইস ব্যাংকগুলো এখন আমানতকারীদের কিছু তথ্য প্রকাশ করছে।

এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের আমানতকারীদের গোপনীয়তা নিশ্চিত করতে তথ্য দেয়ার ক্ষেত্রে অনেক কঠোরতা বহাল রাখা হয়েছে। বাংলাদেশে সক্রিয় বিদেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো আমানতকারী প্রতিষ্ঠানের বা গ্রুপের তথ্য চাইলে ব্যাংকগুলো দিতে পারবে।

তবে কোনো একক আমানতকারীর তথ্য চাইলে তা দেয়া যাবে না। শুধু প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীদের তথ্য প্রকাশ করা যাবে। দেশি ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে আইনের সুনির্দিষ্ট বিধান ছাড়া আমানতকারীদের কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।

বর্তমানে এ আইনের আওতায় কোনো মামলা থাকলে ওই মামলাও নতুন আইনের আওতায় দায়ের করা বলে গণ্য হবে। নতুন আইনে এর নিষ্পত্তি হবে। আইনের খসড়া অনুযায়ী কোনো গ্রাহক মৃত্যুবরণ করলে নমিনির লিখিত আদেশ দ্বারা তথ্য ব্যাংক প্রকাশ করতে পারবে।

গ্রাহক জীবিত থাকলে তার লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো তথ্য প্রকাশ করা যাবে না। ব্যাংককে সেবা দেয়ার জন্য চুক্তিবদ্ধ আইনজীবী, পরামর্শক বা উপদেষ্টা ছাড়া অন্য কারও কাছে তথ্য প্রকাশ করা যাবে না।

আইনে আউটসোর্সিং ব্যবস্থার আওতায় ব্যাংকিং বা অনুষঙ্গ কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সীমিত আকারে তথ্য প্রকাশ করা যাবে। ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত নয় এমন কোনো সেবাদানকারী তৃতীয় পক্ষের কাছেও তথ্য প্রকাশ করা যাবে।

বিজনেস আওয়ার/১৩ এপ্রিল, ২০১৯/এ