বাংলাদেশ আর মায়ানমার নয় সারা পৃথিবীর মানব সঙ্কটের এক সংকটময় নাম রোহিঙ্গা, যেখানে মানবতার কবর রচিত হয়েছে!

রোহিঙ্গাদের ইতিহাসের খন্ডচিএঃ

ঐতিহাসিকভাবে রোহিঙ্গা হলো পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের একটি ইন্দো-আর্য জনগোষ্ঠী। ইতিহাসের তথ্য মতে, ৭ম ও অষ্টম শতাব্দীতে প্রথম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি বার্মায় আসা শুরু করে। প্রথমদিকের এই মাইগ্র্যান্টরা ছিল আরবের নাবিক ও ব্যবসায়ী যদিও অধিকাংশ রোহিঙ্গা ইসলাম ধর্মের অনুসারি কিছু সংখ্যক হিন্দু ধর্মের অনুসারিও রয়েছে,মধ্য আরাকানের নিকটবর্তী ম্রক-ইউ এবং কাইয়্যুকতাও শহরতলীতেই বসবাসের সুচনা করে।

এভাবে বার্মার আরাকান অঞ্চলে ৭ম থেকে ১৩শ শতকে ও ১৫শ শতকে বসতি স্থাপন শুরু করে। ইতিহাসবিদদের মতে ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ কর্তৃক বার্মা উপনিবেশায়নের ফলে বাংলাদেশ থেকে অনেকে কৃষি-শ্রমিক হিসাবে রাখাইনে দেশান্তরিত হয়, যাঁদেরকে পরবর্তীতে রোহিঙ্গা হিসাবে উল্লেখ করা হয়।

১৭৯৯ সালে সর্বপ্রথম ইতিহাস তুলে ধরেন ফ্রান্সিস বুকানান নামক একজন স্কটিশ শল্যবিদ। ফ্রান্সিস বুকানানের তথ্যমতে, বার্মাতে তৎকালীন আরাকান সাম্রাজ্যে (বর্তমানের রাখাইন প্রদেশ) “মোহাম্মদীন” নামক মুসলিম গোষ্ঠী বহু আগে থেকেই বসবাস করতো “রোয়িংগা” নামে।

১৮৯১ সালের ব্রিটিশ আদমশুমারি তথ্যনুসারে, আরাকানে তখন মুসলিম জনসংখ্যা ছিল ৫৮,২৫৫ জন, যা ১৯১১ সালে বেড়ে ১,৭৮,৬৪৭ জনে দাঁড়ায়।

রোহিঙ্গারা সর্বপ্রথম আক্রমন ও জুলুমের শিকার হয় ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে। বার্মার খ্রিস্টান রাজা সে সময় আরাকান দখল করে নেন। তারপর রোহিঙ্গারা বড় ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় ১৯৪২ সালে, যখন জাপান বার্মা দখল করে নেয়। এসব নির্যাতনের সব মাত্রা ছাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু হয় ১৯৬২ সালে।

ধারাবাহিক আক্রমন ও জুলুমের ১৯৮৪, ১৯৮৫, ১৯৯০ এবং ২০১২ সালে রোহিঙ্গা উচ্ছেদে বর্বরতম অভিযান পরিচালনা করে বার্মার সামরিক জান্তা। ২০১৩ সালে জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিশ্বের অন্যতম নিগৃহীত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সমগ্র পৃথিবীর মানুষ খুব ভালোভাবেই জানে রোহিঙ্গারা কত নিষ্ঠুর ও বর্বর নির্যাতনের শিকার। তাদের দোষ কি? তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় তারাই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করা মানুষ। সেই মানুষগুলোর কি দুরবস্থা! কত ভয়ংকর ভাষায় বর্ণনা করা কঠিন।

পৃথিবীতে বহু দেশে শরণার্থী সংকটের সমস্যা আছে কিন্তু রোহিঙ্গাদের মতো এতো বৃহৎ জনগোষ্ঠী পৃথিবীর কোন প্রান্তে শরণার্থী হিসেবে নেই এমনকি কাছাকাছি ও নেই।

পরিসংখ্যানে এমন দেখা যাচ্ছে যত রোহিঙ্গা বর্তমানে রোহিঙ্গা শিবিরের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছেন তার মধ্যে ৬০ ভাগেরও অধিক শিশু। পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, রোহিঙ্গাদের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার খুবই অস্বাভাবিক বেশী, যেটাকে জনসংখ্যা বিস্ফোরন হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যায়।

অতি পরিতাপের বিষয় মোড়ল রাষ্ট্রগুলো তাদের ব্যবসায়িক ফায়দা, অধিপত্য, কর্তৃত্ব, হাসিলে অতি তৎপর, সত্যিকার অর্থে তারা কি চাচ্ছে? রোহিঙ্গা সংকটের সত্যিকারেই বাস্তবসম্মত সমাধান কোন পথে! মিয়ানমারের সবচেয়ে কাছের বন্ধু চায়না, ভারত, রাশিয়া, এমনকি অতি ক্ষুদ্র ভিন্নধর্মী মুসলিম বিদ্বেষী দেশ ও গোষ্ঠীগুলো রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়াচ্ছে না।

পৃথিবীর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা, দেশী-বিদেশের এনজিও, বাংলাদেশের মানুষ ব্যক্তিগত উদ্যোগে রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এবং এখনো রোহিঙ্গাদের পাশে আছে।

বাংলাদেশের মতো ঘনবসতি ও জনবহুল একটি স্বল্পোন্নত ও তুলনামূলক ধীরগতির অগ্রগামী একটি দেশে এই বিপুল সংখ্যক নিগৃহীত, নির্যাতিত, বঞ্চিত স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ হওয়া বিশাল জনগুষ্টিকে আশ্রয় দিয়েছে, বস্ত্র দিয়েছে, খাবার দিয়েছে, চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে মানবিক সহায়তার যা কিনা পৃথিবীর বুকে মানব জাতির ইতিহাসে, বাঙালি জাতির মানব সেবার বিরল দৃষ্টান্ত, ইতিহাসে চিরকাল রবে।

মিয়ানমারের মত বিরাট এক ভূখণ্ড এই মানুষগুলোর কি বসবাস করার কোন অধিকারই নেই। আমরা বাংলাদেশের মানুষ হিসেবে কি কখনো রোহিঙ্গা সংকটের একটা সমাধান দেখতে পাবো?

রোহিঙ্গারা কি তাদের বাপ দাদার জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে বিশ্ব মোড়লদের কৃতদাস হয়ে থাকবে। আমরা কি তাদের নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে দেখব না? রোহিঙ্গারা কি যাযাবরের মতো আমাদের এই ভূখণ্ডে বসবাস করবে! তাদের কি কোন স্বাধীন সত্তা থাকবে না?

রোহিঙ্গাদের অনাগত প্রজন্ম তাদের সন্তানরা কি কখনো মানুষ হিসেবে অন্যান্য জাতির কাছে নিজেদের সত্তার পরিচয় থেকে চির বঞ্চিত হবে। রোহিঙ্গারা কি চিড়িয়াখানা প্রাণীদের মত লালিত পালিত হবে। এই সভ্য জাতি, সভ্য সম্প্রদায় কি জবাব দিবে তাদের কি কিছুই করার নেই!

তাদের স্ব-ভূমিতে ফিরে যাওয়া তো তাদের জন্মগত ও পৈতৃক অধিকার তাহলে কেন আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, মানবতা ও ন্যায়ের পক্ষে সমগ্র বিশ্ব এখনো সজাগ হচ্ছি না! আমরা কি আশা করতে পারি একটু দেরি হলেও রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে, অন্যায় বিনাশ হবে মানবতা ও স্বাধীনতা উজ্জীবিত হয়ে পৃথিবীতে আবার নতুন ইতিহাস রচিত হবে।

লেখক: সবুর মিয়া, বেসরকারি চাকুরীজীবী।

বিজনেস আওয়ার/১২ জুন, ২০১৯/এ