বিজনেস আওয়ার ডেস্কঃ ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন প্রতি বছরের ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে। গতবারের দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিল ‘ওয়ার্কিং টুগেদার টু প্রিভেন্ট সুইসাইড’ অর্থাৎ ‘আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করি একসঙ্গে’।

এক গবেষণায় দেখা গিয়েছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রতি লাখে ৩৯ দশমিক ৬ জন আত্মহত্যা করে।

বহির্বিশ্বে ছেলেদের মধ্যে আত্মহত্যার হার বেশি হলেও বাংলাদেশে ব্যতিক্রম। বাংলাদেশে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি এবং তা সাধারণত অল্প বয়সী টিন এজারদের মধ্যে।

মানুষ নানা কারণে আত্মহত্যা করতে পারেন এর মধ্যে ডিপ্রেশন, ব্যক্তিত্ব্যে সমস্যা, গুরুতর মানসিক রোগ বা স্বল্পতর মানসিক রোগ। তাছাড়া মাদকাসক্তি, এনজাইটি, অপরাধ বোধ, আত্মহত্যায় প্ররোচনা, অশিক্ষা, দারিদ্র্য, দাম্পত্য কলহ, প্রেম-কলহ, অভাব অনটন, দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগা, যৌন নির্যাতন, মা-বাবার ওপর অভিমান, পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট, প্রেমে ব্যর্থ ও প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে আত্মহত্যা করেন। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে কারণ থাকে অজানা।

বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ পুরুষ ও নারী আত্মহত্যা করে, যা যেকোনো যুদ্ধে নিহতের চেয়েও অনেক বেশি। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে ১ জন নারী বা পুরুষ আত্মহত্যা করছেন।

সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা সংঘটিত হয় ডিপ্রেশন বা বিষন্নতার জন্য।

ডিপ্রেশন কী?

ডিপ্রেশন একটি ভয়াবহ মানসিক ব্যাধি যা একজন মানুষকে সবার অজান্তে তিলে তিলে শেষ করে দেয়। বর্তমানে বিশ্বে প্রায় তিনশ মিলিয়ন (১ মিলিয়ন=১০ লাখ) ডিপ্রেশনের রোগী রয়েছেন।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ৫ জনের ১ জন মানুষ কোনো না কোনো ধরনের ডিপ্রেশন বা এনজাইটিতে ভুগছেন।

ডিপ্রেশনের ভয়াবহ দিকটি হচ্ছে আক্রান্ত রোগীরা নীরবে-নিভৃতে আত্মহত্যা করে বসেন। বিশ্বের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের মৃত্যুর প্রধান কারন ডিপ্রেশন জনিত আত্মহত্যা।

ডিপ্রেশন বেশি দেখা যায় মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে।

বাংলাদেশের শতকরা ১৮ থেকে ২০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো প্রকারের ডিপ্রেশন বা এনজাইটিতে ভুগছেন। পরিবারের অনেকে হয়তো জানেন-ই না যে, তারা ডিপ্রেশনের রোগী। আমাদের অনেকেই আছেন ডিপ্রেশন সম্পর্কে অজ্ঞ এবং কেউ কেউ ডিপ্রেশন রোগই মনে করেন না।

ডিপ্রেশন থেকে ডায়াবেটিস ও হাইপ্রেশার হয়ে থাকে। আবার উল্টোটাও হয়। ডিপ্রেশন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। অনেক সময় বৃদ্ধ, শিশু, কিশোর এমনকি সন্তান সম্ভবা মা বা প্রসূতি মায়েদের ও ডিপ্রেশন হয়, এবং তারা আত্মহত্যার পথ বেছে নেন।

বিশ্বের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি ডিপ্রেশনের রোগী ছিলেন। তাদের মধ্যে চাঁদে ভ্রমণকারী এডুইন অলড্রিন, প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন, সাহিত্যিক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, উইস্টন চার্চিল, বিখ্যাত "হেরি পোর্টার" এর লিখিকা জে কে রওলিং, গ্রেমি এওয়ার্ড খেতাব প্রাপ্ত গায়িকা শেরিল ক্রো, যুক্তরাস্ট্রের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আল গোরের স্ত্রী' রয়েছেন।

মার্কিন নভোচারী অলড্রিনের দাদি ও ডিপ্রেশনের রোগী ছিলেন এবং তিনি আত্মহত্যা করেন। হেরি পোর্টারের লেখিকা রো'লিং ডিপ্রেশনের জন্য মাঝেমধ্যে আত্মহত্যার কথা ভাবতেন।

ডিপ্রেশনের রোগীরা আত্মহত্যা করেন বেঁচে থাকার কোন মানে খুঁজে পেতে ব্যর্থ হয়ে।

ডিপ্রেশন নিয়ে লজ্জা নয়। ডিপ্রেসিভ রোগীর প্রতি সহমর্মিতার হাত বাড়িয়ে দিন, তাদের সঙ্গে ডিপ্রেশন নিয়ে আলাপ করুন, এবং তাদের চিকিৎসার জন্য যথাযথ পদক্ষেপ নিন।

ইদানীং অনেক মেডিকেল স্টুডেন্টকেও ডিপ্রেশনের জন্যে অগোচরে আত্মহত্যা করার খবর পাওয়া যাচ্ছে।

ডিপ্রেশনের প্রধান কিছু লক্ষণ-

♦ সারাক্ষণ মনমরা হয়ে থাকা

♦ উৎসাহ উদ্যম হারিয়ে ফেলা

♦ ঘুম কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া

♦ রুচি কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া

♦ ওজন কমে যাওয়া বা বেড়ে যাওয়া

♦ কাজকর্মে শক্তি না পাওয়া

♦ মনোযোগ হারিয়ে ফেলা

♦ মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া

♦ নিজেকে নিঃস্ব অপাঙক্তেয় মনে করা

♦ অযাচিত অপরাধবোধ

♦ আত্মহত্যার কথা বলা, ভাবা, চেষ্টা করা

এ লক্ষণগুলো টানা দু'সপ্তাহের বেশি থাকলে আমরা তাকে মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসওয়ার্ডার এর রোগী বলি, এবং তাকে আত্মহত্যার ঝুঁকিতে আছেন বলা যায়।

চিকিৎসা:

সাইকিয়াট্রিস্টের তত্ত্বাবধানে থেকে নানান প্রকারের কার্যকরী এন্টিডিপ্রেসেন্ট ড্রাগ, সাইকোথেরাপি ও কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে একজন ডিপ্রেশনের রোগীকে সম্পূর্ণরূপে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। সাধারণত এমিট্রিপটাইলিন, সিটালোপ্রাম, এস-সিটালোপ্রাম, মিরটাজাপিন এন্টিডিপ্রেসেন্ট হিসেবে খুবই কার্যকরী।

লেখক: ডা. মো. সাঈদ এনাম ওয়ালিদ, সাইকিয়াট্রিস্ট

এমবিবিএস (ডিএমসি,কে ৫২)

মেম্বার, আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন মেম্বার, আমেরিকান একাডেমি অব নিউরোলজি।

বিজনেস আওয়ার/১০ সেপ্টেম্বর,২০১৯/ আরআই