সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি, এমন সময় দুজন রিক্সা চালকের কথপোকথন কানের ভেতর দিয়ে সোজা অন্তরে গিয়ে ধাক্কা খেয়ে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো।

একজন অন্যজনকে উৎসাহ দিচ্ছে, "প্রজা না বাঁচলে রাজা বাঁচে না" এ যেন অনেকটা এরকম, "নগর পুড়িলে দেবালয় কি এড়ায়।" তাদের ভাষ্য তারা ট্যাক্স, চাঁদা, ঘুষ সব কিছু দিয়ে তাদের রক্ষক পুশছে, তাই তাদের কিছু হওয়ার আগে, রক্ষক কথায় না পারলে, হাত-পা এমনকি যদি প্রয়জন হয়, বুক দিয়ে হলেও রক্ষা করবে।

আমরা চাই চিরদিন ওরা এই বিশ্বাস নিয়ে থাকুক। ওরা যতদিন এই বিশ্বাস লালন করবে ততদিন, এর উপর আমল করবে, ততদিন আমরা আমাদেরকে এক অনন্য উঁচু জায়গায় নিয়ে যেতে পারবো। আমরা বিশ্বের বুকে রোল মডেল হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করতে পারবো, আরো পারবো বিশাল ব্যবধানে সুইস ব্যাংকে ব্যক্তিগত একাউন্টের দিক থেকে প্রথম হতে, এমনকি অতি ধনীর তালিকায় নিজেদের জায়গা অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভাবে প্রথম স্থান অধিকার করা। আমাদের ধারে-কাছে অন্য কোন রাষ্ট্র বা রাজ্য থাকবে তা বরদাস্ত করবো না, কখনও মেনেও নিতে পারবো না, আর হতেও দেব না।

কদিন আগে জাতির বিশাল কল্যাণে, গ্যসের দাম ১৫০-১৭৫ টাকা বৃদ্ধি করা, যুক্তি আমাদের এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গ্যাস আমদানি করতে হবে। যদিও অডিটে দেখা যায়, দাম এবং আমদানির ভারসাম্য আগের মত ঠিকই আছে।

এ ক্ষেত্রে ছোটবেলার একটা গল্প মনে পড়ল। একজন চায়ের দোকানদার চা বানানোর জন্য এক বাড়ি থেকে প্রতিদিন দুই লিটার দুধ কেনে। কিন্তু দুধ কম হওয়ায়, দুধের মালিক এক লিটার দুধ দিয়ে প্রতিদিন তার ছেলেকে পাঠায়। ছেলে অতি বুদ্ধিমান। বাবার অজান্তেই, সে আরো এক লিটার পানি মিশিয়ে দিয়ে আসে। এক লিটার দুধে এক লিটার পানি থাকায় দুধে ভালো জ্বাল উঠেনা। তবুও সে কোনরকম অভিযোগ না করে পুরো মাস দুধ নেয়। মাসের শেষে বিল দিতে গিয়ে, দুধওয়ালার সাথে কথা বলে সব জানতে পারে। দুধওয়ালা তখন বলে আচ্ছা মোট ৬০ লিটারে ৫৮ লিটারের দাম দিলেই চলবে।

কয়েকদিন আগে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, গ্যাসের যে হিসাব করেছে, সেটা ভুল হওয়া স্বত্বেও তিনি বর্তমান নির্ধারিত দাম দেওয়ার জন্য বলেন। ভুল হোক আর সঠিক হোক, ওনাদের ইচ্ছায়, আমাদের কর্ম। ওনারা প্রমাণ করতে পেরেছেন, ওনাদের ভুল হওয়াটাই জাতির বিশাল কল্যাণে রুপান্তরিত হবে। যেমনটি আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, "দেশের উন্নয়ন চাইলে, গ্যাসের বর্তমান দাম দিতে হবে। "

রিক্সা বন্ধ হোক তা প্রত্যেক নগরবাসী চায়। ঢাকা শহরের মহামারী জ্যামের অন্যতম প্রধান কারণ এই রিক্সা। কিন্তু এত রিক্সা চালক, তাদের বিকল্প ব্যবস্থা না করে কিভাবে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিগন হঠাৎ রিক্সা বন্ধ করে দিলেন সেটা শুধু তারাই বলতে পারবে। আমাদের মত মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য রিক্সা একইসাথে আরামদায়ক ও নিরাপদ। বিশেষ করে অতি গরমে একজন প্রেশারের রোগীকে বাসে চড়ে কিছুদূর যেতে হলে, তখন তার জন্য অ্যাম্বুলেন্সই সবচেয়ে বেশী প্রয়োজন হয়ে পড়বে।

দেশে অতি ধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু ধনীর সংখ্যা বাড়েনি। ঢাকা শহরে এমন অনেক জায়গা আছে যেখানে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বাসে করে যেতে হলে অনেক সময় ক্ষেপণ হবে এমনকি দুর্ভোগেরও স্বীকার হতে হবে। যেটা রিক্সা সময় এবং দূর্ভোগ দুই-ই কমাতে পারে।

সর্বোপরি একটা রিক্সা রক্ষা করা মানে, একটা পরিবার রক্ষা করা। একটা রিক্সার উপর নির্ভর করে অনেক গুলো মানুষ। এখন সবাই সচেতন। রিক্সাওয়ালারাও তাদের সন্তানদের অন্যকোনো কাজে না লাগিয়ে লেখা-পড়া শেখাচ্ছে। ওই শিক্ষানবিশদের শিক্ষাটাও এই রিক্সাকেই কেন্দ্র করে বেড়ে উঠছে। অনেক গুলো অনাহারী চোখ তাকিয়ে থাকে কখন তাদের বাবা/স্বামী কিছু উপার্জন করে নিয়ে আসবে।

ঢাকা শহরকে মেগা-সিটি গড়তে হলে অবশ্যই রিক্সা বন্ধ করতে হবে তবে তার জন্য এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে ও তাদের পরিবারের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা নিতে হবে।

আব্দুল্লাহ আল মামুন,শিক্ষার্থী,ইংরেজি বিভাগ,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়