বিজনেস আওয়ার প্রতিবেদক : গাইবান্ধা-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকাণ্ডের পর প্রায় দুই মাস ধোঁয়াশার মধ্যে ছিল স্থানীয় পুলিশ। পরে হত্যার কাজে ব্যবহৃত একটি বন্দুকের সূত্র ধরে সেই রহস্যের সমাধান হয়। পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে লোহমর্ষক কাহিনী।

পুলিশ জানায়, ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকেই সংসদ সদস্য লিটনকে হত্যার পরিকল্পনা করতে থাকেন একই আসনের সাবেক এমপি কর্নেল (অব.) ডা. আবদুল কাদের খাঁন। আর এজন্য নানামুখী প্রেক্ষাপট তৈরিতেও কাজ করেন তিনি। সর্বোপরি সুন্দরগঞ্জের রাজনৈতিক মেরুকরণের সুযোগটিই কাজে লাগান কাদের।

সংশ্লিষ্ঠ একাধিক সুত্রে জানায়, লিটনের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে থাকা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের প্রলোভন ও উসকানি দিয়ে তার বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা ছড়ানোর চেষ্টা করেন কাদের খাঁন। ২০১৫ সালের ২ অক্টোবর লিটন মাতাল অবস্থায় গাড়ি নিয়ে সুন্দরগঞ্জ থেকে উপজেলার বামনডাঙ্গায় নিজের বাড়িতে ফেরার পথে ৯ বছরের শিশু সৌরভকে গুলি করেন।

পরে সৌরভকে বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স রংপুর মেডিক্যালে যাওয়ার পথে লিটন ও তার লোকজন আটকে রাখেন বলেও অভিযোগ ওঠে। এই ঘটনায় তার বিরুদ্ধে গড়ে তোলা হয় আন্দোলন। এমপি লিটনের লাইসেন্স করা অস্ত্র জব্দ ও ফেরত না দেওয়ার নেপথ্যেও ভূমিকা রাখেন কাদের।

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, রাজনৈতিক কারণে কাদের খাঁনের সঙ্গে বিরোধ ছিল লিটনের। কিন্তু হত্যার মাধ্যমে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে— সেটা তারা কল্পনাও করতে পারেননি। এমনকি হত্যাকাণ্ডের পরও পারিবারিক বিরোধসহ কিছু বিষয় উদ্দেশ্যমূলকভাবে সামনে নিয়ে আসা হয়। এর নেপথ্যের কুশীলবও ছিলেন কাদের খাঁন।

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ধোপাডাঙ্গারী এক যুবলীগ নেতা বলেন, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গাইবান্ধা-১ (সুন্দরগঞ্জ) আসনে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনজুরুল ইসলাম লিটন এমপি হওয়ার পর থেকেই তার ইমেজ নষ্ট করার জন্য নানা প্রপাগান্ডা করতে থাকেন একই আসনের সাবেক এমপি কাদের খাঁন।

শিশু সৌরভকে গুলি করার কয়েকদিন পর এক সন্ধ্যায় ধোপাডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের সামনে কয়েকজন ক্যাডার নিয়ে উপস্থিত হন কাদের খাঁন। সেখানে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই প্রপাগান্ডা চালাতে থাকেন।

কাদের বলেন, গাইবান্ধা-১ আসনে আবার নির্বাচন হবে। এ অবস্থায় হাবিবুর ও ইয়াকুবসহ আওয়ামী লীগের স্থানীয় কয়েকজন নেতা-কর্মী তাকে 'পঁচা মাল' উল্লেখ করে প্রতিবাদ করেন। তখন কাদের খাঁন অস্ত্র বের করে তাদের গুলি করার হুমকি দিয়ে বলেন, লিটন জেলে যাবে এবং তার সাজা হয়ে যাবে। পরে তিনি সেখান থেকে চলে আসেন।

সৌরভকে গুলির ঘটনার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ও সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার মেয়র আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে সেখানে এমপি লিটনের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে ওঠে, যার নেপথ্যে স্থানীয় জাতীয় পার্টি ও জামায়াত নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছিলেন। এই আন্দোলন চাঙ্গা করতে প্রচুর অর্থও খরচ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়নে কর্নেল (অব.) কাদের খাঁন এমপি নির্বাচিত হন। এরপর তার বিরুদ্ধে টিআর-কাবিখার অর্থ আত্মসাতসহ দুর্নীতির নানা অভিযোগ ওঠে।

২০১২ সালে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক (বর্তমানে বহিষ্কৃত) চন্দন কুমার সরকার কাদেরের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ (দুদক) বিভিন্ন দফতরে টিআর-কাবিখার অর্থ আত্মসাতের লিখিত অভিযোগ করেন। পরে তদন্ত শেষে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে চারটি মামলা দায়ের করে দুদক— যা এখনও বিচারাধীন।

তখন চন্দন সরকার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মনজুরুল ইসলাম লিটনের সঙ্গেই বেশি সময় কাটাতেন। কাদেরের ধারণা ছিল, চন্দনকে ব্যবহার করে লিটন তার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ করিয়েছেন। পরে লিটন এমপি নির্বাচিত হওয়ার পরও চন্দন বেশ কিছু দিন তার সঙ্গে ছিলেন।

কিন্তু বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নিতে না পেরে চন্দন সাবেক এমপি কাদেরের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আর এ সুযোগটি লুফে নেন কাদের। হত্যাকাণ্ডের দিন পর্যন্ত কাদের খান চন্দনকে ব্যবহার করেছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা আহমেদ বলেন, লিটন হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধের কারণে হয়েছে। জামায়াত সবসময় তাকে সরিয়ে দিতে এবং আওয়ামী লীগের অবস্থান দুর্বল করতে নানাভাবে প্রেক্ষাপট তৈরির কাজ করেছে। সাবেক এমপি কাদেরের সঙ্গেও রাজনৈতিক কারণে তার কিছুটা বিরোধ ছিল। কিন্তু কাদের খাঁন এভাবে একজন এমপিকে হত্যা করে পথ পরিষ্কার করবেন, তারা কেউ তা আঁচ করতে পারেননি।

বিজনেস আওয়ার/২৮ নভেম্বর, ২০১৯/এ